গণতন্ত্রকে আমরা প্রায়ই নির্বাচন, ভোট আর দলীয় রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলি। কিন্তু গণতন্ত্রের আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার কাঠামোর ভেতরে — কীভাবে আইন তৈরি হয়, কে কাকে থামাতে পারে, আর শেষ পর্যন্ত কার হাতে চূড়ান্ত ক্ষমতা জমা হয়। সংসদ এক কক্ষের হবে, নাকি দুই কক্ষের — এই প্রশ্নটি তাই নিছক সাংগঠনিক বিষয় নয়; এটি ক্ষমতার নকশা নিয়ে মৌলিক বিতর্ক।
দ্বিকক্ষ সংসদে সাধারণত একটি নিম্ন কক্ষ থাকে, যেখানে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বসেন, আর একটি উচ্চ কক্ষ থাকে, যা আইনকে দ্বিতীয়বার যাচাই করে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, ফ্রান্সে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও সেনেট — এই কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কিন্তু তাড়াহুড়া করে নয়। এক কক্ষ যদি রাজনৈতিক আবেগের প্রতিনিধিত্ব করে, অন্য কক্ষ সেখানে যুক্তির ব্রেক হিসেবে কাজ করে।
অন্যদিকে এককক্ষ সংসদ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কাঠামো সহজ, দায়বদ্ধতা স্পষ্ট, প্রশাসনিক খরচ কম। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন একটি দল বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং কার্যত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বাধা ছাড়া আইন পাস করতে পারে। তখন সংসদে বিতর্ক থাকলেও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ একদলীয় হয়ে যায়। বাংলাদেশ এই ফাঁদে বারবার পড়েছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্নটি আসে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে। সংবিধান একটি দেশের মৌলিক চুক্তি — এটি বদলানো স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু যখন সংবিধান সংশোধন ব্যবহার হয় ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে, বিরোধী কণ্ঠ সীমিত করতে বা ক্ষমতার ভারসাম্য ধ্বংস করতে — তখন সেটিই হয়ে ওঠে স্বৈরাচারের দরজা। ইতিহাস সাক্ষী, সামরিক ট্যাংক নয়, বরং সাংবিধানিক সংশোধনের মধ্য দিয়েই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে বারবার।
এই প্রেক্ষাপটেই জুলাই সনদের গুরুত্ব বোঝা দরকার। রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণ শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। সেই আন্দোলনের মূল দাবিগুলোকে সাংবিধানিক কাঠামোতে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টাই এই সনদ। গণভোটে জনগণ সরাসরি রায় দিয়েছে এর পক্ষে। সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো সুনির্দিষ্ট — কোনো দল নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান পরিবর্তন করে অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকতে পারবে না, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই টার্মে সীমাবদ্ধ থাকবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংরক্ষিত হবে। এই তিনটি শর্তই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
কিন্তু বিএনপির ভূমিকা এখানে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। দলটি শুরুতে সনদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই সুর বদলাল। গণভোটের ফলাফলকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে সাংবিধানিক সংশোধন পরিষদে শপথ নিতে অস্বীকার করল। এটি কোনো আদর্শিক অবস্থান নয় — এটি বিশুদ্ধ ক্ষমতার হিসাব। আর সেই হিসাবে ভারতের রাজনৈতিক চাপে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন দেওয়ার ইঙ্গিত থাকলে, এটি হবে গণআন্দোলনের সাথে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা।
দ্বিকক্ষ ব্যবস্থা এই ঝুঁকি কমাতে পারে, যদি দুই কক্ষের গঠন সত্যিই ভিন্ন হয়, সংবিধান সংশোধনে সুপারমেজরিটি প্রয়োজন হয়, এবং আদালত স্বাধীন থাকে। কিন্তু কাঠামো একাই যথেষ্ট নয়। যদি একই রাজনৈতিক শক্তি দুই কক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিচারব্যবস্থা দুর্বল থাকে, তাহলে কাগজে যতই সুন্দর হোক, বাস্তবে ভারসাম্য ভেঙে পড়বেই।
স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আমরা একটি সত্যিকারের স্থিতিশীল রাষ্ট্র কাঠামো দাঁড় করাতে পারিনি। বারবার দেখা গেছে, যে-ই ক্ষমতায় আসে, ক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সীমাবদ্ধ করার বদলে নিজের নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত করতে চায়। এই চক্র ভাঙতে না পারলে নাম বদলাবে, দল বদলাবে, কিন্তু সিস্টেম বদলাবে না। আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদী শক্তি বাংলাদেশে বারবার তৈরি হবে।
গণতন্ত্র ভাঙে একদিনে না। ধীরে ধীরে, নিয়ম বদলাতে বদলাতে ভাঙে। জুলাই সনদ সেই ভাঙনের বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দেয়াল তোলার সুযোগ। এই সুযোগকে যদি রাজনৈতিক দরকষাকষির পণ্য বানানো হয়, তাহলে দায় শুধু বিএনপির নয় — দায় আমাদের সকলের, যারা চুপ থাকব।
এখন প্রশ্ন একটাই — আমরা কি কাঠামো ঠিক করব, নাকি একই ইতিহাস বারবার দেখব?
-এনামুল হক খান
তোদের গন আদালতে বিচার করা হবে। তোরা দেশের শত্রু জাতীর শত্রু। রাজাকার এর বাচ্চা
তোরা রাজাকার। তোরা দেশের শত্রু। তোদের বিচার একদিন হবে বাংলাদেশে। সাহস থাকলে দেশে এসে কথা বল।