March 17, 2026

Banner Image

বিচিন্তা

যন্ত্রের যুগে মানুষের ঠিকানা কোথায়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পেশার ভবিষ্যৎ এবং যে প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া চলবে না

“ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, মানুষের অর্থনৈতিক মূল্য হয়তো শূন্যে নেমে আসবে।” — ইউভাল নোয়া হারারি যখন হোমো ডিউস বইয়ে এই কথাটি লিখেছিলেন, তখন অনেকে এটিকে দার্শনিক অতিশয়োক্তি ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, কথাটা আর কাল্পনিক ভবিষ্যদ্বাণী মনে হয় না। মনে হয় একটি সতর্কতা, যা আমরা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নিইনি।

শিল্পবিপ্লবের ইতিহাস আমাদের একটি স্বস্তিদায়ক গল্প শিখিয়েছে — যন্ত্র আসে, কিছু পেশা যায়, কিন্তু নতুন পেশা তৈরি হয়। ১৮০০ সালে ইংল্যান্ডে কৃষিশ্রমিক কমেছে, কিন্তু কারখানার শ্রমিক বেড়েছে। ১৯৮০-র দশকে কম্পিউটার এলে টাইপিস্ট গেছে, কিন্তু প্রোগ্রামার, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, আইটি সাপোর্ট এসেছে। এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটাই আমাদের আশার ভিত্তি। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব এই নিদর্শনটিকে ভাঙছে — এবং এটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। আগের প্রতিটি বিপ্লবে যন্ত্র মানুষের হাতের কাজ নিয়েছে, মাথার কাজ রেখে দিয়েছে। কারখানায় যখন বয়নযন্ত্র এল, তখন কারখানা পরিচালনার জন্য ম্যানেজার লাগল, হিসাব রাখার জন্য অ্যাকাউন্ট্যান্ট লাগল, যন্ত্র ঠিক রাখার জন্য প্রকৌশলী লাগল। মস্তিষ্কনির্ভর কাজ সবসময় একটি নিরাপদ আশ্রয় ছিল। এবার সেই আশ্রয়ের দরজায়ও কড়া নাড়া পড়েছে। আজকের এআই একইসঙ্গে রেডিওলজি রিপোর্ট বিশ্লেষণ করছে, আইনি চুক্তিপত্র খসড়া করছে, সফটওয়্যার কোড লিখছে, অনুবাদ করছে, ডিজাইন বানাচ্ছে এবং আর্থিক পূর্বাভাস দিচ্ছে। এগুলো সবই উচ্চশিক্ষিত মানুষের পেশা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কার্ল বেনেডিক্ট ফ্রে এবং মাইকেল ওসবোর্ন তাঁদের বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে আমেরিকার ৪৭ শতাংশ চাকরি আগামী দুই দশকে অটোমেশনের উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। McKinsey Global Institute-এর হিসাবে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৪০ থেকে ৮০ কোটি মানুষকে নতুন পেশায় যেতে হতে পারে।

ইউভাল নোয়া হারারি হোমো ডিউস বইয়ে একটি ধারণার কথা বলেছেন যা আমাদের সভ্যতার ইতিহাসে একেবারে নতুন — useless class বা “অকেজো শ্রেণি”। এটি শুধু বেকারত্বের কথা নয়। পুঁজিবাদের ইতিহাসে সবচেয়ে দরিদ্র শ্রমিকেরও একটি অর্থনৈতিক ভূমিকা ছিল — সে পণ্য উৎপাদন করত, সে বাজার তৈরি করত, সে করও দিত। তাকে দমিয়ে রাখতে হলেও তাকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার ছিল, কারণ তার শ্রমের দরকার ছিল। হারারির প্রশ্ন হলো — যখন অ্যালগরিদম উৎপাদন করবে এবং রোবট সেবা দেবে, তখন কোটি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা কোথায়? তারা কি শুধু রাজনৈতিক কারণে টিকে থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা বলেন তা আরও উদ্বেগজনক — অভিজাত শ্রেণির কাছে এই “অকেজো” মানুষগুলো কেবল বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে, যাদের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হয়তো ভিডিও গেম এবং মাদকের সুলভ সরবরাহ দিয়ে শান্ত রাখতে হবে। এটি কোনো সায়েন্স ফিকশন নয়, বরং একটি সম্ভাব্য সামাজিক প্রকৌশল। হারারি তাঁর ২১ লেসনস ফর দ্য ২১স্ট সেঞ্চুরি বইতে আরও সরাসরি বলেছেন যে আগের বিপ্লবে মানুষ এক ক্ষেত্র থেকে আরেক ক্ষেত্রে সরে গেছে, কিন্তু এবার সরে যাওয়ার জায়গাটাই অনিশ্চিত। একজন বাস্তুচ্যুত কৃষক উনিশ শতকে কারখানায় গিয়েছে কারণ কারখানার কাজ শেখা কঠিন ছিল না। একজন বাস্তুচ্যুত কারখানাশ্রমিক বিশ শতকে ব্যাংকে বা অফিসে গেছে কিছুটা শিক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু একজন বাস্তুচ্যুত অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা রেডিওলজিস্ট একবিংশ শতাব্দীতে কোথায় যাবে — যেখানে এআই তার চেয়ে দ্রুত, নির্ভুল এবং অক্লান্ত?

এটি বোঝার জন্য কাজের প্রকৃতিকে দুটি মাত্রায় ভাগ করতে হবে — রুটিন বনাম অ-রুটিন, এবং শারীরিক বনাম জ্ঞানভিত্তিক। আগের বিপ্লবে রুটিন-শারীরিক কাজ গেছে — সেলাই, কাটা, বহন করা। এবার রুটিন-জ্ঞানভিত্তিক কাজও যাচ্ছে — তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া, ডেটা বিশ্লেষণ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে সেই পেশাগুলো যেখানে কাজটি মূলত তথ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট নিয়মে প্রক্রিয়া করা — ব্যাংক কর্মকর্তা, বীমা দাবি মূল্যায়নকারী, কর পরামর্শদাতা, প্যারালিগ্যাল, মেডিকেল ডায়াগনস্টিশিয়ান, এমনকি অনেক ধরনের সাংবাদিকতা। Goldman Sachs-এর ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এআই বিশ্বব্যাপী ৩০ কোটি পূর্ণকালীন সমতুল্য চাকরি প্রতিস্থাপন করতে পারে। তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে আছে সেই কাজগুলো যেখানে মানবিক সংযোগ অপরিহার্য — থেরাপিস্ট, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজকর্মী, আইনজীবী যারা আদালতে মানবিক যুক্তি উপস্থাপন করেন। এবং সেই কাজগুলো যেখানে অনিয়মিত শারীরিক দক্ষতা লাগে — নলকূপ মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, বাগানের মালি। বিচিত্র হলেও সত্য — একজন দক্ষ প্লাম্বার আজকের অনেক সফটওয়্যার প্রকৌশলীর চেয়ে বেশি নিরাপদ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট একটি নতুন মাত্রা পায়। আমাদের অর্থনীতির তিনটি মূল স্তম্ভ — তৈরি পোশাক, রেমিট্যান্স এবং সেবা খাত — সবগুলোই বিভিন্নভাবে এই ঝুঁকির মুখে। তৈরি পোশাক শিল্পে ইতিমধ্যে অটোমেটেড সেলাইমেশিন এবং রোবোটিক কাটিং ব্যবহার শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সরবরাহকারীদের উপর খরচ কমানোর চাপ দিচ্ছে, এবং অটোমেশন সেই উপায়। আমাদের ৪০ লাখের বেশি পোশাকশ্রমিক, যাদের বিশাল অংশ নারী, এই পরিবর্তনের সরাসরি শিকার হতে পারেন। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও ছবিটা উদ্বেগজনক। মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমাদের অভিবাসী শ্রমিকরা মূলত নির্মাণ, গৃহস্থালি সেবা এবং পরিষেবা খাতে কাজ করেন। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে স্মার্ট সিটি এবং অটোমেটেড সেবা খাতে বিশাল বিনিয়োগ করছে। আগামী দশকে এই বাজারে আমাদের শ্রমিকের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। আর সেবা খাতে — ব্যাংকিং, টেলিকম, কাস্টমার কেয়ার — এআই চ্যাটবট এবং অটোমেটেড সিস্টেম ইতিমধ্যে মানবিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনছে। আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ এই খাতে নিযুক্ত।

সমস্যার কেন্দ্রে আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। আমরা এখনো এমন মানুষ তৈরি করছি যারা মুখস্থ করতে পারে, নির্ধারিত নিয়মে সমস্যা সমাধান করতে পারে, এবং পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে পারে — ঠিক সেই দক্ষতাগুলো যা এআই সবচেয়ে ভালো করে। হারারি এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন — ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে শেখার দক্ষতা, কোনো নির্দিষ্ট বিষয় শেখা নয়। কারণ আপনি আজ যে দক্ষতা অর্জন করছেন, দশ বছর পরে সেটা অপ্রচলিত হয়ে যেতে পারে। যে মানুষ দ্রুত নতুন জিনিস শিখতে পারে, নিজেকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে, সেই টিকে থাকবে। এর মানে শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সহানুভূতি, আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ এবং নৈতিক বিচারবুদ্ধি — এগুলো এমন দক্ষতা যা এআই এখনো অনুকরণ করতে পারে না, এবং সম্ভবত অনেকদিন পারবেও না। কিন্তু আমাদের স্কুল-কলেজে এগুলো মূল্যায়নের কোনো কাঠামো নেই। আমরা পাঁচটি গণিতের সমস্যা সমাধানের জন্য নম্বর দিই, কিন্তু একটি নতুন সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আলোচনায় ক্রমশ একটি ধারণা সামনে আসছে — ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম বা UBI। ধারণাটি সহজ: রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিককে কাজের সঙ্গে সম্পর্ক নিরপেক্ষভাবে একটি ন্যূনতম আয় দেবে। ফিনল্যান্ড, কেনিয়া এবং কানাডায় এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়েছে। এলন মাস্ক, মার্ক জাকারবার্গ থেকে শুরু করে অনেক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এটিকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু UBI-র বিরুদ্ধেও শক্তিশালী যুক্তি আছে। এই অর্থের যোগান কোথা থেকে আসবে? এআই কোম্পানিগুলোর উপর কর? রোবট ট্যাক্স? এবং শুধু অর্থই কি যথেষ্ট? কাজ মানুষের জন্য শুধু আয়ের উৎস নয় — এটি পরিচয়, মর্যাদা, সামাজিক সংযোগ এবং অর্থপূর্ণতার উৎস। আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো — কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে যে বিপুল সম্পদ তৈরি হচ্ছে, তা কি মুষ্টিমেয় প্রযুক্তি কর্পোরেশনের কাছে কুক্ষিগত থাকবে, নাকি সমাজের কাছে ফিরে আসবে? এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন, প্রযুক্তিগত নয়। এবং এই প্রশ্নের উত্তর বাজার নিজে থেকে দেবে না — দিতে হবে গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।

এই সংকটের মধ্যেও আশার কারণ আছে। ইতিহাস বলে, প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও নতুন ধরনের পেশা তৈরি হবে — এআই প্রশিক্ষক, নৈতিকতা পর্যবেক্ষক, মানব-যন্ত্র মধ্যস্থতাকারী, ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা পরিকল্পক। এআই নিজেই অনেক মানবিক সম্ভাবনাকে বিস্তৃত করছে। একজন গ্রামের ডাক্তার যদি এআই ডায়াগনস্টিক সহায়তা পান, তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি রোগীকে সাহায্য করতে পারবেন। একজন শিক্ষক যদি এআই ব্যবহার করেন, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা সম্ভব হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, ক্যান্সার গবেষণা, নতুন উপকরণ আবিষ্কার — এই ক্ষেত্রগুলোতে এআই মানবতার সবচেয়ে বড় বন্ধু হতে পারে। কিন্তু এই সুফল কার কাছে পৌঁছাবে? যে সমাজ ইতিমধ্যে অসম, সেখানে এআই সেই অসমতাকে আরো তীব্র করতে পারে — যদি না আমরা সচেতনভাবে তা প্রতিরোধ করি।

শেষ পর্যন্ত এই সংকট মোকাবেলার জন্য যা দরকার তা প্রযুক্তিগত নয়, রাজনৈতিক। শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পুনর্গঠন দরকার — পাঠ্যক্রম থেকে মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করার দক্ষতা, দলগত কাজ, সৃজনশীলতা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রাধান্য দিতে হবে। আজীবন শেখার একটি জাতীয় অবকাঠামো দরকার, যেখানে বয়স্ক কর্মীরাও নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। সামাজিক সুরক্ষার নতুন ব্যবস্থা দরকার — যাতে প্রযুক্তিগত কারণে কাজ হারালে মানবিক মর্যাদা না হারায়। এবং সবচেয়ে জরুরি যেটি — একটি সৎ, সাহসী জাতীয় সংলাপ। যেখানে আমরা স্বীকার করব যে এই পরিবর্তন অনিবার্য, কিন্তু এর সুফল কার কাছে যাবে, এর ক্ষতি কে বহন করবে — তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। হারারি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে থেকে ভালো বা মন্দ নয় — এটি একটি হাতিয়ার। হাতিয়ারটি কার হাতে থাকবে, কার স্বার্থে ব্যবহৃত হবে — এটিই আসল প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর যন্ত্র দেবে না। দিতে হবে আমাদের — নাগরিক হিসেবে, ভোটার হিসেবে, অভিভাবক হিসেবে এবং মানুষ হিসেবে। যন্ত্র হয়তো একদিন আমাদের অনেক কাজ করবে। কিন্তু কোন পৃথিবীতে বাঁচতে চাই — সেই সিদ্ধান্তটা মানুষের।

— Anamul Haque khan

Share: Facebook Twitter Linkedin
Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *