বাংলাদেশে “সমকামিতা” শব্দটি উচ্চারণ করলে যে প্রতিক্রিয়া আসে, তা প্রায়ই তীব্র এবং একমাত্রিক। ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক নিন্দা, এমনকি দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার ছায়া — এ সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি কেবল বিতর্কিতই নয়, রীতিমতো নিষিদ্ধ। অথচ প্রশ্নটি একটাই: সমকামিতা কি কোনো “পছন্দ”, “বিকৃতি” বা “পশ্চিমা আমদানি” — নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর জৈবিক, স্নায়বিক এবং বিবর্তনীয় বাস্তবতা? বিজ্ঞান দীর্ঘদিন ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। এবং উত্তরগুলো আমাদের প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও অর্থবহ।
১৯৯১ সালে নিউরোসায়েন্টিস্ট Simon LeVay একটি যুগান্তকারী গবেষণা প্রকাশ করেন। তিনি দেখান যে সমকামী পুরুষদের হাইপোথ্যালামাসের একটি নির্দিষ্ট অংশ — INAH-3 — বিষমকামী পুরুষদের তুলনায় আকারে উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট এবং নারীদের মতো। Science জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাটি প্রথমবারের মতো মস্তিষ্কের গঠনের সঙ্গে যৌন অভিমুখিতার একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক স্থাপন করে। LeVay নিজেই পরে স্বীকার করেন যে এই গবেষণা “কারণ” প্রমাণ করে না, বরং একটি সম্পর্ক চিহ্নিত করে। কিন্তু দরজা খুলে গিয়েছিল।
জিনতত্ত্বের দিক থেকে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি এসেছে যমজ গবেষণা থেকে। J. Michael Bailey ও Richard Pillard ১৯৯১ সালে দেখান, একই ডিমের (identical) যমজদের মধ্যে একজন সমকামী হলে অপরজনেরও সমকামী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ, যেখানে ভিন্ন ডিমের (fraternal) যমজদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা মাত্র ২০-২৫ শতাংশ। এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে জেনেটিক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। ২০১৯ সালে Science জার্নালে প্রকাশিত একটি বিশাল জিনোম গবেষণায় — যেখানে পাঁচটি দেশের প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে — গবেষকরা বেশ কয়েকটি জেনেটিক ভেরিয়েন্ট শনাক্ত করেন যা সমকামী আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো একক “গে জিন” নেই — বরং শত শত জিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রভাব একসাথে কাজ করে।
এপিজেনেটিক্স এই ধাঁধায় আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে। গবেষকরা দেখেছেন যে জরায়ুতে ভ্রূণের বিকাশের সময় হরমোনের মাত্রা — বিশেষত অ্যান্ড্রোজেনের পরিমাণ — যৌন অভিমুখিতা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। আরও চমকপ্রদ হলো “ফ্র্যাটার্নাল বার্থ অর্ডার ইফেক্ট” — পুরুষদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কারো বড় ভাইয়ের সংখ্যা যত বেশি, তার সমকামী হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। Ray Blanchard-এর গবেষণা অনুযায়ী প্রতিটি বড় ভাই এই সম্ভাবনা প্রায় ৩৩ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মায়ের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা পুত্রসন্তানের নির্দিষ্ট প্রোটিনের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়, এবং এই প্রতিক্রিয়া পরবর্তী পুত্রসন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশকে প্রভাবিত করে।
বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একটি প্রশ্ন অনেকের মনে জাগে: যদি সমকামিতা জেনেটিক হয়, তাহলে এটি বিবর্তনের মধ্য দিয়ে টিকে আছে কীভাবে? উত্তরে বিজ্ঞানীরা বলেন, “কিন সিলেকশন” তত্ত্ব অনুযায়ী, সমকামী ব্যক্তিরা সরাসরি সন্তান না জন্মালেও তাদের পরিবারের সদস্যদের সন্তান লালন-পালনে সহায়তা করে — ফলে একই জিন অন্যদের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। এছাড়া একই জিনগুলো বিষমকামীদের মধ্যে প্রজননশীলতা বাড়াতে পারে। Andrea Camperio Ciani-এর গবেষণায় দেখা গেছে, সমকামী পুরুষদের মায়ের দিকের মহিলা আত্মীয়রা গড়ে বেশি সন্তান জন্ম দেন।
আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সংস্থাগুলোর অবস্থান এ বিষয়ে সুস্পষ্ট। American Psychological Association, American Psychiatric Association এবং WHO — সকলেই একমত যে সমকামিতা কোনো মানসিক রোগ নয়, এটি মানব যৌনতার একটি স্বাভাবিক প্রকরণ। ১৯৭৩ সালে APA সমকামিতাকে তার রোগের তালিকা থেকে বাদ দেয়। WHO ১৯৯০ সালে বাদ দেয়। এই সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক চাপে নয়, বরং সঞ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়া।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রণীত দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যগত আইনের অংশ নয় — এটি ব্রিটিশদের নিজস্ব উদ্ভাবন। ভারত ২০১৮ সালে এই আইন বাতিল করেছে। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ও মন্দিরের ভাস্কর্যে সমলিঙ্গীয় সম্পর্কের ঐতিহাসিক উপস্থিতি স্বীকৃত। অর্থাৎ “এটি পশ্চিমের আমদানি” — এই যুক্তিটি ইতিহাসের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়।
বিজ্ঞান একটি বিষয়ে পরিষ্কার: সমকামিতা “রূপান্তর থেরাপি”তে পরিবর্তনযোগ্য নয়। গবেষণা দেখায় যে এই ধরনের থেরাপি যৌন অভিমুখিতা পরিবর্তন করে না, বরং বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। রবার্ট স্পিৎজার — যিনি ১৯৭৩ সালে সমকামিতাকে DSM থেকে বাদ দেওয়ার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং পরে ২০০১ সালে রূপান্তর থেরাপি নিয়ে একটি বিতর্কিত গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন — ২০১২ সালে সেই গবেষণার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন এবং গবেষণাটি প্রত্যাহার করেছেন।
বিজ্ঞান আজ যা বলছে তা হলো: সমকামিতা একটি জটিল বহুমাত্রিক ঘটনা, যেখানে জেনেটিক, এপিজেনেটিক, হরমোনাল এবং স্নায়বিক উপাদানগুলো একসাথে কাজ করে। এটি কোনো “পছন্দ” নয়, “রোগ” নয়, “বিকৃতি” নয়। নোবেলজয়ী জীববিজ্ঞানী E.O. Wilson তাঁর On Human Nature গ্রন্থে লিখেছেন, মানব যৌনতা কেবল প্রজননের হাতিয়ার নয় — এটি সামাজিক বন্ধন, মানসিক সংযোগ এবং পরিচয় গঠনের একটি জটিল জৈববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে এই আলোচনা এখনও নিষিদ্ধ ঘরের কোণে আবদ্ধ। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রশ্নের উত্তর সংস্কৃতির ভয়ে থামে না।
তথ্যসূত্র: LeVay, S. (1991). Science, 253(5023) · Bailey & Pillard (1991). Archives of General Psychiatry · Ganna et al. (2019). Science, 365(6456) · Blanchard, R. (2018). Archives of Sexual Behavior · Camperio Ciani et al. (2004). Proceedings of the Royal Society B · APA (2008). Answers to Your Questions · Wilson, E.O. (1978). On Human Nature. Harvard University Press · Spitzer retraction (2012). Archives of Sexual Behavior, 41(4)