ইতিহাসের পাঠ হলো — সাম্রাজ্যগুলো যখন তাদের শেষ তাস খেলে, তখন সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরে সীমান্তের দুই পারে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলা, যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের আকাশ বিদীর্ণ করলো এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলেন, তখন শুধু একটি মানুষ নয় — একটি যুগের সমাপ্তি ঘটলো। কিন্তু সেই সমাপ্তি যে নতুন সংকটের দরজা খুলে দিয়েছে, তা আমাদের মতো দেশের মানুষও অনুভব করছে হাড়ে হাড়ে।
এই যুদ্ধকে কেউ কেউ “দ্বাদশ দিনের যুদ্ধে”র স্বাভাবিক পরিণতি বলছেন — যে সংঘাত ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিন স্থায়ী হয়েছিল, তারপর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু এবারের যুদ্ধ মৌলিকভাবে ভিন্ন। ২০২৫ সালে লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো। এবারের উদ্দেশ্য স্পষ্টতর — শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, অর্থাৎ ইরানি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিলোপ। ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি যৌথ হামলা পরিচালিত হয়েছে, এবং যুদ্ধের ১৭তম দিনেও বিস্ফোরণ থামেনি। আল জাজিরার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইরান, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
এখানে একটি গভীর ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন উঠে আসে: ইরানকে দুর্বল করার এই পরিকল্পনা কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনবে? নাকি, যেমনটা আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইরান এখন “অস্তিত্বের লড়াই” হিসেবে এই যুদ্ধকে দেখছে এবং তাই দ্রুত পরিণতির বদলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ক্লান্তি তৈরি করাই তাদের কৌশল? রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্স মরগেন্থাউ তাঁর “Politics Among Nations”-এ লিখেছিলেন, শক্তির ভারসাম্য ধ্বংস হলে যা তৈরি হয় তা শান্তি নয়, বরং অনিশ্চয়তার এক গভীর শূন্যতা। সেই শূন্যতাই আজ মধ্যপ্রাচ্যের উপর ছায়া ফেলছে।
ইরান তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হর্মুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে — সেই সংকীর্ণ জলপথ যার ভেতর দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল প্রবাহিত হয়। অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের বিশ্লেষণ বলছে, যদি তেলের দাম দুই মাস ধরে ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলারে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি তৈরি হবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এই সংকটকে বর্ণনা করেছে “কাঠামোগত অভিঘাত” হিসেবে — কেবল একটি আঞ্চলিক ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের মেরুদণ্ড ভাঙার শুরু। আইএমএফের পুরোনো গবেষণা বলে, তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি ০.৪ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধি ০.১৫ শতাংশ কমে যায়। আর এখন তেলের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
চিনা কূটনীতির দিকে তাকালে একটি নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ইরান চিনা জাহাজকে হর্মুজ দিয়ে যেতে দিচ্ছে বলে খবর রয়েছে এবং ইউয়ানে লেনদেনের বিনিময়ে বাণিজ্য সুবিধা দেওয়ার কথাও আলোচিত হচ্ছে। এটি কেবল যুদ্ধকালীন কৌশল নয় — এটি ডলার-কেন্দ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতির বিকল্প একটি ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইনের “ওয়ার্ল্ড সিস্টেম থিওরি” স্মরণ করুন — প্রতিটি বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে তেল, বাণিজ্য পথ এবং মুদ্রার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। আজ সেই তিনটিরই রূপান্তর ঘটছে একসাথে।
বাংলাদেশের কথা ভাবলে ছবিটি আরও উদ্বেগজনক। দৈনিক স্টার জানাচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের সাবেক ঢাকা-প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে তুলনা করেছেন একটি ভূমিকম্পের সাথে — যা কেবল সাময়িক ক্ষতি করে না, বরং কাঠামোটাকেই নাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর, এবং হর্মুজ প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত হয় দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানিকৃত তেল। ইতোমধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার থেকে ১১৯ ডলারে পৌঁছেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইট স্থগিত রেখেছে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছে, জ্বালানি রেশনিং চালু হয়েছে। পোশাক খাতের ১,২০০ টনের বেশি কার্গো ঢাকার বিমানবন্দরে আটকে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর রেমিটেন্স ঝুঁকিতে — যা মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় উৎস।
এই প্রেক্ষাপটে একটি কঠিন নৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে: ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কথিত লক্ষ্য — পারমাণবিক বিস্তার ঠেকানো ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান — কতটা বৈধ, যখন ইরানের একটি মেয়েদের স্কুলে হামলায় ১৮০ জনের মৃত্যুর খবর আসে? জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও মানবিক নিরাপত্তার মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তা আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর একটি। হ্যানা আরেন্ডট তাঁর “The Origins of Totalitarianism”-এ লিখেছিলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা সবচেয়ে বিপজ্জনক হয় যখন সে নিজেকে মুক্তির ভাষায় উপস্থাপন করে। ইরানের জনগণকে ‘মুক্ত’ করার ডাক দিচ্ছেন নেতানিয়াহু — অথচ সেই মুক্তির বোমায় মরছেন স্কুলের মেয়েরা।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। প্রথমত, ইরানে শাসনব্যবস্থার পতন এবং একটি নতুন সরকার গঠন — কিন্তু আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, “রাষ্ট্রের পতন” এবং “শাসন পরিবর্তন” এক জিনিস নয়। ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা বলে, পুরোনো কাঠামো ভেঙে পড়লে যা তৈরি হয় তা গণতন্ত্র নয়, বরং দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ। দ্বিতীয়ত, একটি কূটনৈতিক সমাধান — ২০২৫ সালের জুনে ওমানের মধ্যস্থতায় যেভাবে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, সেরকম কিছু। কিন্তু এবারের “ডিকেপিটেশন স্ট্রাইক” পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে — নেতৃত্বশূন্য ইরানে কার সাথে আলোচনা হবে? তৃতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আতঙ্ক — যেখানে ইরান অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে মার্কিন জনমতকে ক্লান্ত করার কৌশল নেবে। হর্মুজ প্রণালী বন্ধ, উপসাগরীয় দেশগুলোয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তেলের দাম শতাধিক ডলার — এটাই ইরানের “অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিরোধের” যুক্তি।
এই যুদ্ধের আরেকটি মাত্রা রয়েছে যা প্রায়শই উপেক্ষিত হয়: তথ্যযুদ্ধ। ইসরায়েলি প্রভাব নেটওয়ার্ক ইরানে ৩,০০০ ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট দিয়ে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ উসকানোর চেষ্টা করেছে বলে গবেষকরা জানাচ্ছেন। এআই-জেনারেটেড ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে এভিন কারাগারে হামলার পর জনগণকে রাস্তায় নামতে উদ্বুদ্ধ করতে। এটি একবিংশ শতাব্দীর নতুন যুদ্ধাস্ত্র — যেখানে বুলেটের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে আখ্যানের নিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে এই মুহূর্তে নিজেকে কোথায় দাঁড় করাবে, সেটি কেবল কূটনৈতিক প্রশ্ন নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্নও। ভারত ও চীন থেকে জরুরি তেল আমদানি এবং বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করার যে প্রচেষ্টা চলছে তা স্বল্পমেয়াদী প্রশমন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে, এই যুদ্ধ বাংলাদেশের শক্তিনিরাপত্তার দুর্বলতা আবারো সামনে এনেছে: নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, বহুমুখী বাণিজ্য অংশীদারিত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে রেমিটেন্সের উৎস বৈচিত্র্যায়ন — এগুলো এখন কৌশলগত অগ্রাধিকার, বিলাসিতা নয়।
ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, যুদ্ধ কদাচিৎ তার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করে — কিন্তু সবসময়ই অঘোষিত পরিণতি রেখে যায়। ১৯৭৩ সালের তেল সংকট আরব বিশ্বকে ক্ষমতাহীন করেনি, বরং পশ্চিমা শিল্পজগৎকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত করেছিল। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ সাদ্দাম হোসেনকে হটিয়েছে, কিন্তু ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়িয়েছে। এবারের যুদ্ধ যদি ইরানের রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে দেয়, তাহলে শূন্যতায় কে আসবে — গণতন্ত্র, না নতুন কোনো বিশৃঙ্খলা? আর সেই প্রশ্নের উত্তর আজ কারো কাছে নেই।
হর্মুজ প্রণালীর সংকীর্ণ জলরাশির ওপারে যে আগুন জ্বলছে, তার উত্তাপ পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকার গলির চায়ের দোকান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ইয়ার্ড পর্যন্ত। এই যুদ্ধ শেষ হোক বা না হোক, বিশ্ব আর আগের মতো থাকবে না। প্রশ্ন হলো — নতুন যে বিশ্ব তৈরি হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো দর্শক হয়ে থাকবে, না সচেতন অংশগ্রহণকারী?
তথ্যসূত্র:
১. “2026 Iran War”, Wikipedia, March 2026. https://en.wikipedia.org/wiki/2026_Iran_war
২. “Twelve-Day War”, Wikipedia, 2025. https://en.wikipedia.org/wiki/Twelve-Day_War
৩. “US-Israel strikes on Iran: February/March 2026”, House of Commons Library, UK Parliament. https://commonslibrary.parliament.uk/research-briefings/cbp-10521/
৪. “12 days: How 2025 Iran blueprint trapped US, Israel in longer war”, Al Jazeera, March 11, 2026. https://www.aljazeera.com/features/2026/3/11/
৫. “Twenty questions (and expert answers) about the Iran war”, Atlantic Council, March 2026. https://www.atlanticcouncil.org/dispatches/twenty-questions-and-expert-answers-about-the-iran-war/
৬. “Economic impact of the 2026 Iran war”, Wikipedia. https://en.wikipedia.org/wiki/Economic_impact_of_the_2026_Iran_war
৭. “Iran war could shake Bangladesh economy ‘like an earthquake'”, The Daily Star, March 2026. https://www.thedailystar.net/business/news/iran-war-could-shake-bangladesh-economy-earthquake-4124891
৮. “Iran war could raise Bangladesh’s trade costs”, The Daily Star. https://www.thedailystar.net/business/economy/news/iran-war-could-raise-bangladeshs-trade-costs-4120131
৯. “How the War With Iran Is Impacting Economies in Asia”, TIME Magazine, March 16, 2026. https://time.com/article/2026/03/16/us-israel-iran-war-trump-asia-economy-oil-energy-inflation-recession/
১০. “The global price tag of war in the Middle East”, World Economic Forum, March 2026. https://www.weforum.org/stories/2026/03/the-global-price-tag-of-war-in-the-middle-east/
১১. “Oil prices swing wildly amid mixed messages over Iran war”, Al Jazeera, March 11, 2026. https://www.aljazeera.com/economy/2026/3/11/oil-prices-swing-wildly-amid-mixed-messages-over-iran-war
১২. “Iran War scenarios: The oil price that breaks parts of the economy”, Oxford Economics, March 2026. https://www.oxfordeconomics.com/resource/iran-war-scenarios-the-oil-price-that-breaks-parts-of-the-economy/
১৩. “Bangladesh Secures Diesel After Iran War Disrupts Fuel Shipments”, Modern Diplomacy, March 2026. https://moderndiplomacy.eu/2026/03/10/bangladesh-secures-diesel-after-iran-war-disrupts-fuel-shipments/
১৪. Morgenthau, Hans J. Politics Among Nations: The Struggle for Power and Peace. McGraw-Hill, 1948.
১৫. Arendt, Hannah. The Origins of Totalitarianism. Schocken Books, 1951.
১৬. Wallerstein, Immanuel. The Modern World-System. Academic Press, 1974.