March 18, 2026

Banner Image

বিচিন্তা

রিলসের ফাঁদ: যখন অ্যালগরিদম আমাদের মনকে পণ্য বানিয়ে ফেলে

স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎ থামুন। এই মুহূর্তে আপনি কি সত্যিই কিছু খুঁজছিলেন, নাকি শুধু স্ক্রোল করছিলেন — কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া, প্রায় ঘোরের মধ্যে? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে জানবেন — আপনি একা নন। এবং এটি আপনার দোষও নয়। এটি একটি ইঞ্জিনিয়ারড ট্র্যাপ, যা তৈরি হয়েছে ঠিক এই মুহূর্তটির জন্য।

আমরা প্রায়ই সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তিকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখি — “ইচ্ছাশক্তি নেই বলে ফোন ছাড়তে পারছ না।” কিন্তু এই ব্যাখ্যা মূল সত্যকে ঢেকে রাখে। সত্যটি হলো, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক — এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম মানুষের মনোবিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে এবং সেগুলোকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে শোষণ করে। এটি আসক্তি নয় — এটি নকশাকৃত আসক্তি। পার্থক্যটি নৈতিকভাবে বিশাল।

নিউরোসায়েন্সের ভাষায় বললে, রিলসের অ্যালগরিদম মূলত কাজ করে ডোপামিনের “ভেরিয়েবল রিওয়ার্ড” নীতিতে। স্কিনারের ক্লাসিক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, ইঁদুর সবচেয়ে বেশি বারবার লিভার চাপে যখন পুরস্কার আসে অনিশ্চিতভাবে — কখনো আসে, কখনো আসে না। ঠিক এই নীতিতেই কাজ করে স্ক্রোল ফিড: পরের ভিডিওটি কী হবে জানো না, কিন্তু হয়তো পরেরটা অসাধারণ হবে। এই “হয়তো” — এই অনিশ্চয়তাই মানুষকে থামতে দেয় না। Tristan Harris, যিনি একসময় গুগলের “Design Ethicist” ছিলেন এবং পরে “The Social Dilemma” ডকুমেন্টারিতে এই সত্য উন্মোচন করেছেন, বলেছেন এই প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত একটি “race to the bottom of the brain stem” — মানুষের সবচেয়ে আদিম, প্রতিফলক প্রবৃত্তিগুলো দখল করার প্রতিযোগিতা।

এখানে নৈতিক প্রশ্নটি অত্যন্ত ধারালো। Shoshana Zuboff তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ The Age of Surveillance Capitalism-এ এই ব্যবস্থাকে নাম দিয়েছেন “surveillance capitalism” — একটি নতুন অর্থনৈতিক যুক্তি যেখানে মানুষের আচরণ, মনোযোগ এবং মানসিক অবস্থা কাঁচামাল হিসেবে সংগ্রহ করা হয়, প্রক্রিয়া করা হয়, এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করা হয়। আপনি পণ্যটি নন — আপনার মনোযোগ পণ্য। আপনার দুঃখ, আপনার ক্রোধ, আপনার একাকীত্ব — এগুলো ডেটা। এবং এই ডেটা সবচেয়ে ভালো সংগ্রহ হয় যখন আপনি স্ক্রিনে আটকে থাকেন। তাই অ্যালগরিদম সেটাই দেখায় যা আপনাকে রাগায়, ভয় পায়, উত্তেজিত করে — কারণ এই আবেগটি আপনাকে সবচেয়ে বেশিক্ষণ ধরে রাখে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমস্যাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০২৩ সাল নাগাদ ১২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, এবং এর সিংহভাগই স্মার্টফোনে সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক। DataReportal-এর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গড় একজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দিনে প্রায় সাড়ে নয় ঘণ্টা অনলাইনে কাটান, যার মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়াতেই যায় তিন ঘণ্টারও বেশি। এই সময়টা বিশেষত কিশোর ও তরুণদের মধ্যে আরো বেশি। কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতা, মিডিয়া লিটারেসি এবং এই প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা এখনো অত্যন্ত সীমিত। আমরা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করেছি, কিন্তু এটি কীভাবে কাজ করে সেটা বোঝার প্রস্তুতি ছাড়াই।

মনোযোগের ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রশ্নটি এখানে কেন্দ্রীয়। Microsoft-এর ২০১৫ সালের একটি গবেষণা সর্বপ্রথম দাবি করে যে মানুষের গড় মনোযোগ স্প্যান এখন ৮ সেকেন্ডে নেমে এসেছে। সংখ্যাটি নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু অভিজ্ঞতাগত সত্য অস্বীকার করা কঠিন — দীর্ঘ প্রবন্ধ পড়তে কষ্ট হচ্ছে, গভীর চিন্তায় স্থির থাকা কঠিন হচ্ছে, সিনেমার প্রথম দশ মিনিটেই ধৈর্য ফুরিয়ে যাচ্ছে। Johann Hari তাঁর Stolen Focus বইয়ে দেখিয়েছেন এটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয় — এটি একটি সভ্যতাগত সংকট। গভীর চিন্তা, সৃজনশীলতা, সমানুভূতি — এগুলো সবই প্রয়োজন করে “slow attention” — এমন মনোযোগ যা দীর্ঘ, নিরবচ্ছিন্ন, ধৈর্যশীল। যে প্রজন্ম শৈশব থেকে ১৫ সেকেন্ডের রিলসে বড় হয়েছে, তাদের এই ক্ষমতা গড়ে উঠবে কীভাবে?

এই জায়গায় পুঁজিবাদের একটি অন্ধকার মুখ উন্মোচিত হয়। পুঁজিবাদের সমস্যা কেবল শ্রমের শোষণ নয় — এখন সমস্যা হলো মনোযোগের শোষণ। Herbert Marcuse One-Dimensional Man-এ যে “false needs”-এর কথা বলেছিলেন — কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ — আজকের অ্যালগরিদম সেই প্রক্রিয়াকে একটি নতুন স্তরে নিয়ে গেছে। এখন কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হয় সরাসরি নিউরোলজিক্যাল পথে — আমাদের মস্তিষ্কের পুরস্কার-ব্যবস্থাকে হাইজ্যাক করে। এবং এটি ঘটে আমাদের সম্মতি ছাড়া, আমাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে। অনুমতি নেওয়া হয়েছে শুধু ৮০ পাতার “Terms and Conditions” বাক্সে একটি ক্লিকের মাধ্যমে — যা কেউ পড়েনি।

তাহলে আইনের প্রশ্নে আসা যাক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে Digital Services Act (DSA) এর মাধ্যমে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আইন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে KOSA (Kids Online Safety Act) নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক চলছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো — অ্যালগরিদমকে “neutral” বলে আর চালিয়ে দেওয়া যাবে না। একটি অ্যালগরিদম যখন ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের মনোবিজ্ঞানের দুর্বলতা ব্যবহার করে ব্যবহারকারীকে আটকে রাখে, তখন এটি একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত — এবং সেই সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহিতা থাকা উচিত। বাংলাদেশে এই আলোচনা এখনো শৈশবে আছে। আমাদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালায় ডিজিটাল স্বাস্থ্য বা অ্যালগরিদমিক দায়বদ্ধতার কোনো কাঠামো নেই। এটি একটি জরুরি শূন্যতা।

তবে শুধু আইনে সমস্যা সমাধান হবে না। কারণ এই প্রশ্নটি আসলে গভীরে একটি দার্শনিক প্রশ্ন — মানুষের মনোযোগ কি একটি পণ্য হতে পারে? আমাদের সচেতন মুহূর্তগুলো, আমাদের কৌতূহল, আমাদের চিন্তার সময় — এগুলো কি বিক্রি হওয়ার যোগ্য কিছু? Emmanuel Kant যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তিনি হয়তো বলতেন — এই ব্যবস্থা মানুষকে তার সেই “categorical imperative” থেকে বঞ্চিত করছে যা তাকে কেবল পরিসংখ্যানের বাইরে, একটি লক্ষ্যহীন স্ক্রোলিং মেশিনের বাইরে একজন স্বায়ত্তশাসিত সত্তা করে তোলে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগটি তাই কেবল স্ক্রিন টাইমের নয়। উদ্বেগটি হলো — একটি শিশু যদি শৈশব থেকেই শিখে যায় যে বোরডম অসহ্য এবং যেকোনো মুহূর্তে ফোনে পালানো যায়, তাহলে সে কীভাবে শিখবে একা বসে ভাবতে? সে কীভাবে শিখবে একটি কঠিন সম্পর্কে ধৈর্য ধরতে, একটি কঠিন বই শেষ করতে, একটি কঠিন সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়াতে? বোরডম আসলে সৃজনশীলতার ইনকিউবেটর — গবেষণায় দেখা গেছে বোর হওয়া শিশুরা বেশি কল্পনাপ্রবণ হয়। আমরা যদি সেই বোরডমটুকুও কেড়ে নিই, তাহলে আমরা আসলে তাদের ভেতরের মানুষটাকেই অর্ধনির্মিত রেখে যাচ্ছি।

এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ তিনটি স্তরে ভাবতে হবে। ব্যক্তিগত স্তরে প্রয়োজন “intentional media consumption” — কখন, কতটুকু, কেন দেখছি তা নিয়ে সচেতন থাকা। পরিবার ও শিক্ষার স্তরে দরকার ডিজিটাল লিটারেসি — শুধু ফোন ব্যবহার শেখানো নয়, শেখানো এই যন্ত্রটি আপনার সাথে আসলে কী করছে। আর রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে দরকার অ্যালগরিদমিক জবাবদিহিতার আইনি কাঠামো — “engagement maximization”-কে একমাত্র মেট্রিক হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া বন্ধ হওয়া উচিত, এবং প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের ডিজাইন সিদ্ধান্তের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব প্রকাশ করতে বাধ্য করা উচিত।

রিলসের পর্দার আলো নিভিয়ে রাখুন কিছুক্ষণ। এই নীরবতায়, এই একটু অস্বস্তিকর শূন্যতায় — এখানেই আছে আপনার নিজের মনের সাথে পুনরায় পরিচিত হওয়ার সুযোগ। এই সুযোগটা ধীরে ধীরে কেউ কিনে নিচ্ছে। এবং আমরা খুব সস্তায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছি।


তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

Zuboff, S. (2019). The Age of Surveillance Capitalism: The Fight for a Human Future at the New Frontier of Power. PublicAffairs.

Hari, J. (2022). Stolen Focus: Why You Can’t Pay Attention — and How to Think Deeply Again. Crown.

Harris, T. (2020). The Social Dilemma [Documentary]. Exposure Labs / Netflix.

Marcuse, H. (1964). One-Dimensional Man: Studies in the Ideology of Advanced Industrial Society. Beacon Press.

DataReportal. (2024). Digital 2024: Bangladesh. https://datareportal.com/reports/digital-2024-bangladesh

Microsoft Canada. (2015). Attention Spans: Consumer Insights. Microsoft Corporation.

European Union. (2022). Digital Services Act (DSA). Official Journal of the European Union.

Eastwood, J. D., et al. (2012). “The Unengaged Mind: Defining Boredom in Terms of Attention.” Perspectives on Psychological Science, 7(5), 482–495.

Share: Facebook Twitter Linkedin
Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *