April 2, 2026

Banner Image

বিচিন্তা

October 6, 2020 | admin

নোংরা রাজনীতির বাংলাদেশ: আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত ও শিবিরের ক্ষমতার খেলাঘর

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিশেষ করে ক্ষমতাকেন্দ্রিক দলগুলোর আচরণ, আজ যেন এক দুঃস্বপ্নের নাম। এই দেশ এক সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর আমরা দেখছি—এখানে গণতন্ত্র নেই, নৈতিকতা নেই, শুধু আছে হিংসা, ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতার জন্য মরিয়া কিছু রাজনৈতিক দল।

এই ব্লগে আলোচনা করবো চারটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তির কথা—আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ও তাদের ছাত্রসংগঠন শিবির। এদের ইতিহাস, চরিত্র, ষড়যন্ত্র এবং জনগণের সাথে প্রতারণার ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করবো বাস্তব ঘটনার আলোকে।

আওয়ামী লীগ: মুক্তিযুদ্ধের দল থেকে একনায়কত্বের পথে

আওয়ামী লীগ একসময় ছিল আমাদের মুক্তির প্রতীক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দল বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দেয়। কিন্তু আজ এই দলই গণতন্ত্রের কবর রচনা করছে।

ঘটনা: ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন—যেখানে বিরোধী দলকে মাঠেই নামতে দেওয়া হয়নি, ভোটার ছাড়া ভোট হয়ে গেছে। শত শত কেন্দ্র ছিল “কেন্দ্র দখল করা”, আগেই ব্যালট পূর্ণ হয়ে যাওয়া বা ভোটারদের মারধর করে বের করে দেওয়া—এমন ঘটনাবলী দেশের মানুষের চোখে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

দলীয়করণ ও দুর্নীতি: বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ—সব কিছু এখন দলীয় নিয়ন্ত্রণে। তরুণ প্রজন্ম যখন বলে, “বাড়ি বানাতে হলে আওয়ামী লীগ করতে হয়”—তখন বোঝা যায় কী গভীরে গিয়েছে অনৈতিকতা।

বিএনপি: ক্ষমতার জন্য জন্ম, সুবিধাবাদীতার প্রতিচ্ছবি

বিএনপি প্রতিষ্ঠিতই হয়েছিল সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের হাতে। শুরু থেকেই দলটি আদর্শহীনভাবে ক্ষমতায় আসার জন্য মরিয়া থেকেছে। এই দল ক্ষমতায় এলেই গড়ে ওঠে চোরাকারবার, জঙ্গি মদদ, প্রশাসনিক দুর্নীতি।

ঘটনা: ২০০১-২০০৬ সাল—এই সময় ছিল বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় দুর্নীতির যুগ। তারেক রহমানের হাওয়া ভবন থেকে পরিচালিত হতো নিয়োগ, বরাদ্দ ও উন্নয়ন কার্যক্রম। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দায় বিএনপির ঘাড়েই বর্তায়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাবরকে সেই হামলার সময় ‘কভার আপ’ করতে দেখা যায়।

ভোটের রাজনীতি: বিএনপি নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে বারবার বলে “ভোট চুরি হয়েছে”—কিন্তু জনগণের কাছে তাদের কোনো ভিশন নেই, শুধু শেখ হাসিনাকে সরানোর ন্যাকা কৌশল।

জামায়াতে ইসলামী ও শিবির: ধর্মের লেবাসে বিশ্বাসঘাতকতা ও সহিংসতা

জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানভক্ত, একাত্তরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে—তাদের অনেকে এখনো রাজনীতিতে সক্রিয়। দলটি কখনো বিএনপির ছায়াতলে, কখনো গোপনে রাষ্ট্রযন্ত্রে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে যাচ্ছে।

ঘটনা: ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার—যেখানে জামায়াত ও হেফাজত গঠন করে মৌলবাদকে উস্কে দিয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় দেশে চালিয়েছিল পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, রেললাইন ধ্বংস, স্কুলে আগুন লাগানো ইত্যাদি নৃশংস কার্যকলাপ।

শিবিরের ভূমিকা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তারা বিভাজন সৃষ্টি করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্ত্র ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিকে ভয়ংকর রূপ দেয়।

জনগণের মূল্য কী?

এই চারটি শক্তি আসলে জনগণকে ব্যবহার করে শুধু নিজের ক্ষমতা চায়। তাদের রাজনীতি কখনোই গণমুখী নয়, তারা চায় জনগণ যেন বিভ্রান্ত থাকে, দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলুক, যাতে তারা সুযোগ নিতে পারে। আওয়ামী লীগ চায় সারা দেশ হোক “আমার নেত্রীই সব”; বিএনপি চায় “ক্ষমতা ফেরত দাও”, জামায়াত চায় “ইসলামের নামে পাকিস্তানি ভাবাদর্শ ফিরিয়ে আনো”।

সমাধান কোথায়?

সমাধান একটাই—সচেতন নাগরিক সমাজ। আমাদের দরকার এমন নেতৃত্ব, যাদের হাতে নেই হত্যা, যারা ভোটে বিশ্বাস করে, যারা রাজনীতিকে দেশসেবার পথ মনে করে। আর আমাদের, জনগণের, উচিত একে অপরকে দোষারোপ না করে এসব দুর্নীতিপরায়ণ দলের বাইরে বিকল্প খুঁজে বের করা।

গণতন্ত্র কেবল ব্যালটের মাধ্যমে সম্ভব, কিন্তু ব্যালটে ভোট দিলে যে গোনে, তাকে যদি বিশ্বাস করা না যায়—তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ ক্রমেই অন্ধকার।

Share: Facebook Twitter Linkedin
September 12, 2020 | admin

ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় ও বাংলাদেশের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি এখনও একটি বিভ্রান্তির উৎস। কেউ বলেন “হিজড়া,” কেউ বলেন “তৃতীয় লিঙ্গ,” কেউ বা “অস্বাভাবিক।” কিন্তু এই শব্দগুলোর অধিকাংশই একদিকে যেমন সমাজের বদ্ধমূল ধারণাকে প্রকাশ করে, অন্যদিকে আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক বাস্তবতাকে সংকীর্ণ করে তোলে। আমরা যদি সত্যিই একটি সমানাধিকারভিত্তিক সমাজ চাই, তবে আমাদের আগে বুঝতে হবে—ট্রান্সজেন্ডার কারা, তারা কীভাবে সমাজের অংশ, এবং তাদের বিরুদ্ধে আমাদের মনে গেঁথে থাকা ভ্রান্ত ধারণাগুলোর পেছনে কোন সমাজতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ কাজ করেছে।

ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা সেই সব মানুষ, যাদের লিঙ্গ পরিচয় তাদের জন্মলগ্নে নির্ধারিত যৌনাঙ্গের সাথে মেলে না। অর্থাৎ, একজন মানুষ যার জন্মগতভাবে “পুরুষ” বা “নারী” লিঙ্গ নির্ধারিত হলেও, তার মানসিক, সামাজিক বা আত্মপরিচয় হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি নিছকই এক মানসিক বা সামাজিক ব্যাপার নয়, এটি জীববিজ্ঞানের জটিল বাস্তবতার অংশ—যেখানে ক্রোমোজোম, হরমোন, ও নিউরোসাইকোলজিক্যাল উপাদান ভূমিকা রাখে। এই সত্যকে অস্বীকার করা বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে উপেক্ষা করার নামান্তর।

বাংলাদেশের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে হিজড়া সম্প্রদায়কে উপহাস, ভয় ও অবহেলার চোখে দেখা হয়েছে। তাদের অধিকাংশকে পারিবারিকভাবে পরিত্যাগ করা হয়, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে, ফলে তারা নিরুপায় হয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান বা শিশুর জন্মে “দোয়া” করে অর্থ উপার্জনের পথ বেছে নেয়—যা আবার সমাজের আরেকটি বিদ্রূপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এই জীবন তাদের পছন্দের ফল নয়, এটি সমাজের নির্মিত এক ধরনের প্রান্তিকতা। আমরা যদি তাদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতাম, তাদের কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্ত করতাম, তবে এই রাস্তায় তাদের নামতে হতো না।

বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে ‘হিজড়া’ জনগোষ্ঠীকে “তৃতীয় লিঙ্গ” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালে ভোটার তালিকায় “তৃতীয় লিঙ্গ” হিসেবে পরিচয় দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। একে অনেকেই মানবাধিকারের অগ্রগতি হিসেবে দেখলেও, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এই আইনি স্বীকৃতির পাশাপাশি সামাজিক স্বীকৃতি অর্জন না হলে তা নিছকই একটি রাজনৈতিক কাগুজে উদ্যোগ হিসেবে থেকে যায়। ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের আজও সরকারি চাকরিতে গ্রহণ করা হয় না, ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা কঠিন, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকরা কীভাবে তাদের চিকিৎসা করবেন তা জানেন না। এটি আইন আর বাস্তবতার মধ্যকার এক গভীর ব্যবধানের উদাহরণ।

সমস্যার গভীরে গেলে দেখা যায়, ট্রান্সজেন্ডারদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যার মিশেলে। অনেকেই মনে করেন, এটি “পাপ,” “প্রকৃতির বিপরীত,” কিংবা “আল্লাহর শাস্তি।” অথচ ইসলাম, হিন্দুধর্ম কিংবা অন্যান্য ধর্মগুলো ট্রান্সজেন্ডার বিষয়কে সরাসরি নিন্দা করে না; বরং অনেক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় দেখা যায়, ট্রান্সজেন্ডার বা ইন্টারসেক্স মানুষদের প্রতি সহানুভূতি ও সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। মহানবী (সা.)-এর যুগেও “মুখান্নাস” নামক একটি লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠীর কথা হাদিসে এসেছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ধর্মীয় ব্যাখ্যাগুলো সমাজের সুবিধামতো রূপ পেয়েছে, যাতে প্রভাব বিস্তারকারী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বজায় থাকে।

বাংলাদেশে অনেক ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি আছেন, যারা লেখাপড়া করেছেন, চাকরি করতে চেয়েছেন, সমাজের মূলধারায় অবদান রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু সমাজ তাদের দিকে সেই সুযোগটি বাড়িয়ে দেয়নি। তাদের জীবন যেন কেবল “উপদ্রব” বা “হেয় করার বিষয়” হিসেবে দেখা হয়। অথচ জাতিসংঘ বলছে, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। তাহলে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা এই “কেউ” নন কেন?

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উদ্যোগ যেমন ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, নারী দিবসে তাদের আমন্ত্রণ, কিংবা কিছু সংস্থায় তাদের চাকরিতে অন্তর্ভুক্তি—এই প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। তবে এগুলো এখনো বিচ্ছিন্ন এবং প্রতীকি মাত্র। মূলধারায় ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য সুযোগ তৈরি না হলে এটি কেবলই পৃষ্ঠতলের আলংকারিক পরিবর্তন হয়ে থাকবে।

সমাজে বিদ্যমান এই বৈষম্যমূলক মানসিকতা দূর করতে হলে দরকার শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার। পাঠ্যপুস্তকে লিঙ্গ বৈচিত্র্যকে বৈজ্ঞানিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণে তুলে ধরতে হবে। গণমাধ্যমকে ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের “অদ্ভুত চরিত্র” হিসেবে দেখানো বন্ধ করতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদেরকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই ধারণাটি বদলাতে হবে যে, লিঙ্গ শুধুমাত্র শরীর দ্বারা নির্ধারিত হয় না; এটি একজন মানুষের আত্মপরিচয়ের মৌলিক দিক।

আমরা যতক্ষণ না পর্যন্ত এই বৈচিত্র্যকে “অস্বাভাবিকতা” না ভেবে মানবিক স্বীকৃতি দিচ্ছি, ততক্ষণ আমাদের মানবতাবাদ ও ন্যায়বিচারমূলক সমাজ গঠনের দাবি ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়।

Share: Facebook Twitter Linkedin
August 5, 2020 | admin

সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মৌলবাদ: ঐতিহ্যকে আঘাত নয়, আলিঙ্গন করাই উত্তম

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য একটি জাতির আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব উপাদান যুগের পর যুগ ধরে গড়ে উঠেছে সমাজের বিবর্তন, লোকজ বিশ্বাস, ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের ছাঁচে। তবে দুঃখজনকভাবে, কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠী এ সকল বৈচিত্র্যপূর্ণ ঐতিহ্যের ওপর বারবার আঘাত হানে। তারা দেশীয় সংস্কৃতিকে ‘অপবিত্র’, ‘বিধর্মীয়’ বা ‘ইমানবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করে। এ ব্লগে আমরা মৌলবাদীদের এ আচরণের গাঠনিক সমালোচনা করব এবং বিশ্লেষণ করব কীভাবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের সামগ্রিক সুস্থতা ও অগ্রগতিকে ব্যাহত করে।

মৌলবাদ একটি র‍্যাডিকাল চিন্তাধারা, যেখানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট মতবাদকে পরম সত্য ধরে নিয়ে অন্য সকল মতবাদ, সংস্কৃতি বা চিন্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। এটি গড়ে ওঠে ভয়, অজ্ঞানতা ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা থেকে। সংস্কৃতি যেখানে বহুমাত্রিক ও অভিযোজিত, সেখানে মৌলবাদ একরৈখিক এবং অনমনীয়। এই কারণে মৌলবাদ সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিকাশকে দমিয়ে রাখে।

বহু সময় মৌলবাদীরা সংস্কৃতিকে আক্রমণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। লোকজ সঙ্গীত, উৎসব (যেমন পহেলা বৈশাখ), নাট্যচর্চা বা ঐতিহ্যবাহী পোশাককে ধর্মবিরোধী বলে আখ্যা দিয়ে তারা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে একটি ‘আমরা বনাম তারা’ ধাঁচের মেরুকরণ গড়ে তোলে, যা সামাজিক সহাবস্থানকে ধ্বংস করে এবং মৌলবাদীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সহজ করে।

যখন কেউ বলে যে ঢাকাই মসলিন, বাউল সঙ্গীত, কিংবা কীর্তনের মত ঐতিহ্য শুধুই ‘গণহারে শিরক’ – তখন তারা ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ও সমাজবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। এ ধরনের মানসিকতা শুধুমাত্র ধর্মীয় কুসংস্কারই নয়, বরং এটি এক প্রকার সাংস্কৃতিক নির্যাতনও বটে। এর ফলে নতুন প্রজন্ম অতীতের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে যে এখানে ধর্ম ও সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে সহাবস্থান করে এসেছে। পল্লী জীবনের উৎসব, বিয়ে, কৃষিনির্ভর মেলা – এসব কিছুর মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক বন্ধন। মৌলবাদীরা যখন এসব ঐতিহ্যকে আঘাত করে, তখন তারা বাস্তব সমাজবিজ্ঞান নয়, বরং কল্পিত এক ‘শুদ্ধ সমাজ’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যা আসলে কাল্পনিক ও অমানবিক।
শুদ্ধ সংস্কৃতি’র নামে যা মৌলবাদ প্রচার করে, তা একটি চরম স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা। এটি বৈচিত্র্যকে শত্রু মনে করে, ভিন্নমতকে নিধনের মাধ্যমে একক রূপ চাপিয়ে দিতে চায়। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে শুধু সাংস্কৃতিক দারিদ্র্যই নয়, বরং সৃজনশীলতার বিলুপ্তি ঘটায়। একজন নজরুল, হাসন রাজা, কিংবা রবীন্দ্রনাথের উদ্ভব সম্ভব হতো না যদি সমাজ একরৈখিক চাপে পরিচালিত হতো।

দেশীয় সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য কোনো ধর্মের বিপরীতে নয়, বরং মানুষের বহুমাত্রিক জীবনের অংশ। মৌলবাদীদের বিরূপ আচরণ শুধু সংবেদনশীল নয়, তা সমাজবিরোধীও। আজকের সময়ে প্রয়োজন, এসব বিভেদকারী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, এবং এক উদার, জ্ঞানে-ভিত্তিক সংস্কৃতিচর্চা প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, সংস্কৃতিকে বাঁচানো মানে একটি জাতিকে তার আত্মপরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া।

Share: Facebook Twitter Linkedin
July 12, 2020 | admin

বিবর্তনবাদ তত্ত্ব ও বাংলাদেশের জনমানসে তার প্রতিফলন: এক গভীর দ্বন্দ্বের অনুসন্ধান

বিজ্ঞান ও ধর্ম — দুটি জগৎ, দুটি পদ্ধতি। একটির ভিত্তি পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও যুক্তিতে; অন্যটির ভিত্তি বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিক দর্শনে। এই দুটি জগতের সংযোগস্থলে যখন বিবর্তনবাদ তত্ত্বের মতো একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ধারণা এসে দাঁড়ায়, তখন অনেক সমাজেই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দ্বন্দ্ব অনেক বেশি স্পষ্ট এবং জটিল।

বিবর্তনবাদ বা ডারউইনের তত্ত্ব আধুনিক জীববিজ্ঞানের মূল ভিত্তিগুলোর একটি। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত “On the Origin of Species” গ্রন্থে চার্লস ডারউইন প্রাণীর ধাপে ধাপে পরিবর্তন ও অভিযোজনের যে ব্যাখ্যা দেন, তা পরবর্তীতে বহু গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও সমর্থিত হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জীবজগতের বৈচিত্র্য বহু বছরের জেনেটিক পরিবর্তন, প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং অভিযোজনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। মানুষ নিজেও এই প্রক্রিয়ার অংশ — একটি নির্দিষ্ট পূর্বপুরুষ থেকে ধাপে ধাপে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান রূপে পৌঁছেছে।

কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি ধর্মপ্রধান ও ঐতিহ্যভিত্তিক সমাজে এই তত্ত্বটি সহজভাবে গৃহীত হয়নি। এখানকার মানুষদের অধিকাংশই সৃষ্টিতত্ত্বে বিশ্বাসী — অর্থাৎ, একজন সর্বশক্তিমান স্রষ্টা মানুষকে সরাসরি সৃষ্টি করেছেন, এমন বিশ্বাস বহু প্রজন্ম ধরে ধরে চলে আসছে। ফলত, বিবর্তনের ধারণাটি ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত হয়।

ধর্মীয় জড়তা ছাড়াও এই দ্বন্দ্বের পিছনে রয়েছে আরও কিছু বাস্তবিক ও কাঠামোগত কারণ। শিক্ষাব্যবস্থা এক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। জীববিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ে বিবর্তন তত্ত্বের অধ্যায় থাকলেও, তা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে। পাঠদান ও বোঝানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা অনেক সময় নিজেরাও সংকোচ বোধ করেন, বিশেষ করে যখন ছাত্রছাত্রীরা তা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন করে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা একদিকে বিজ্ঞান পড়ছে, আবার অন্যদিকে মনে মনে তা অগ্রহণযোগ্য মনে করছে। এতে করে তারা দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেড়ে ওঠে — বিজ্ঞান শ্রেণিকক্ষে শেখার বিষয়, কিন্তু বাস্তব বিশ্বাসের জায়গায় নয়।

বাংলাদেশে ২০১৭ সালে করা পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৩% মানুষ মনে করেন মানুষ বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। বাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিশ্বাস করেন, মানুষ সরাসরি ঈশ্বরের সৃষ্টি। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় দেশের জনমনে বিবর্তন তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা কত সীমিত।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো — অনেক মানুষ বিবর্তন তত্ত্বকে ভুলভাবে বোঝে। যেমন, অনেকেই ভাবে বিবর্তন মানে “মানুষ বানর থেকে এসেছে” — যা একটি ভুল ব্যাখ্যা। প্রকৃতপক্ষে, বিবর্তনবাদ বলে না যে মানুষ সরাসরি বানর থেকে এসেছে, বরং মানুষ ও বর্তমান বানরের একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিল, যেখান থেকে দুটি ভিন্ন শাখায় বিবর্তিত হয়েছে। এই ভুল তথ্য ও অপব্যাখ্যার কারণেই অনেকেই এই তত্ত্বকে অযৌক্তিক বা হাস্যকর বলে মনে করেন।

অন্যদিকে, ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক কি সবসময় বিরোধপূর্ণ? একথা বলা যাবে না। বিশ্বের বহু বিজ্ঞানী, যারা গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী, তারা বিবর্তন তত্ত্বকে তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন না। উদাহরণস্বরূপ, ড. ফ্রান্সিস কলিন্স — যিনি মানব জিনোম প্রকল্পের প্রধান ছিলেন — একজন খ্রিস্টান, কিন্তু তিনি বিবর্তনের প্রবক্তা। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও এমন বহু মনীষী আছেন, যারা বলেন — কোরআনে কোথাও সরাসরি বিবর্তনকে অস্বীকার করা হয়নি। বরং কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে “ধাপে ধাপে সৃষ্টি”, “চিন্তা কর”, “পর্যবেক্ষণ কর” ইত্যাদি নির্দেশ রয়েছে, যা বিজ্ঞানের অনুসন্ধানমূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে উৎসাহিত করে।

বাংলাদেশে এই দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য প্রয়োজন একটি সুস্থ ও যুক্তিপূর্ণ পরিবেশ, যেখানে বিজ্ঞান ও ধর্মকে মুখোমুখি না দাঁড় করিয়ে পাশাপাশি চিন্তা করা যাবে। সেজন্য প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার। শিক্ষকরা যেন সাহস ও যুক্তির সঙ্গে বিবর্তন তত্ত্ব পড়াতে পারেন, সেজন্য প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত পাঠ্যউপকরণ প্রয়োজন। একইসঙ্গে, মিডিয়াতে — বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় — বিজ্ঞানভিত্তিক সহজবোধ্য কনটেন্ট তৈরি করে তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা যেতে পারে।

আমরা যদি বিবর্তন তত্ত্বকে ধর্মের প্রতিপক্ষ না ভেবে, বিজ্ঞানময় জগৎকে বোঝার একটি পথ হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে দ্বন্দ্ব অনেকটাই লাঘব হবে।

সর্বোপরি, সত্যকে জানতে হলে তা নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে, চিন্তা করতে হবে, এবং নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করার সাহস থাকতে হবে। বিবর্তনবাদের মতো একটি তত্ত্ব আমাদের সেই চিন্তার জগৎকে উন্মোচিত করে দেয় — যেখানে মানুষ জানে, সে একদিন কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এসেছে, এবং ভবিষ্যতে কোথায় যেতে পারে।

Share: Facebook Twitter Linkedin
June 5, 2020 | admin

ভিন্নতা নয়, মানবতা—বাংলাদেশে সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রতি ঘৃণার মনোভাবের শিকড়

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা একদিকে যতই আধুনিকতার দিকে এগোচ্ছে, অন্যদিকে কিছু মানবিক বিষয়ে এখনো রয়ে গেছে চরম রকমের পশ্চাৎপদতা। এর একটি বড় উদাহরণ—সমকামী (LGBTQ+) ও তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) মানুষদের প্রতি বৈষম্যমূলক ও ঘৃণামূলক মনোভাব। তাদের প্রতি সামাজিক অবহেলা, লাঞ্ছনা, এমনকি সহিংসতাও প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ তারা আমাদেরই মতো মানুষ—শুধু লিঙ্গ পরিচয় ও যৌন প্রবণতায় ভিন্ন।

ধর্ম ও সংস্কৃতির ভুল ব্যাখ্যা: ঘৃণার মূল বীজ?

অনেকেই ধর্মীয় অনুশাসনের দোহাই দিয়ে সমকামী বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক ভুল আছে—ধর্ম মানবতা শেখায়, ঘৃণা নয়। ইসলামে যেমন বলা হয়েছে “তোমার প্রতিবেশীকে ভালোবাসো”, তেমনি হিন্দুধর্মে আছে “সব প্রাণেই পরমাত্মা বিরাজমান”। কিন্তু আমরা কি প্রকৃতপক্ষে এই ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোর চর্চা করি, নাকি নিজেদের ভয়, সংকীর্ণতা ও অজ্ঞতা ঢাকতে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করি?

শিক্ষার ঘাটতি ও মিডিয়ার ভূমিকা

আমাদের পাঠ্যবইয়ে কখনো শেখানো হয় না যে যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচয় একটি বৈচিত্র্যময় বিষয়। ‘ছেলে’ মানে শক্তিশালী, ‘মেয়ে’ মানে নরম স্বভাব—এমন জেন্ডার স্টেরিওটাইপ ছোটবেলা থেকেই গেঁথে দেওয়া হয় মনে। ফলে যারা এই নির্ধারিত বৃত্তের বাইরে যায়, তারা হয়ে ওঠে ‘ভিন্ন’—এবং সেই ভিন্নতা থেকেই জন্ম নেয় ভয়, এবং সেই ভয় থেকেই ঘৃণা।

মিডিয়াও বিষয়টিকে সচেতনভাবে ঠিকভাবে উপস্থাপন করে না। বহু সিনেমা ও নাটকে হিজড়াদের দেখানো হয় হাস্যকর চরিত্র হিসেবে—তাদের উপস্থিতি মানেই জোক বা ভয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ তাদের মানুষ নয়, ‘দৃশ্যমান ব্যতিক্রম’ হিসেবে দেখতে শেখে।

বাস্তব চিত্র: পরিসংখ্যান ও নিদর্শন

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে সরকার তৃতীয় লিঙ্গকে আইনি স্বীকৃতি দিলেও বাস্তব জীবনে সেই স্বীকৃতির কোনো ছাপ দেখা যায় না। অধিকাংশ হিজড়াই বেঁচে থাকার জন্য ভিক্ষা, নাচ বা যৌনকর্মে যুক্ত হতে বাধ্য হন। চাকরি তো দূরের কথা, তারা শিক্ষা ও চিকিৎসার মৌলিক অধিকার থেকেও প্রায় বঞ্চিত।

এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকায় বসবাসকারী LGBTQ+ তরুণ-তরুণীদের প্রায় ৮২% স্কুলজীবনে সহপাঠীদের হাতে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর বড় একটা অংশ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। অথচ এরা সকলেই সমাজে দক্ষ নাগরিক হিসেবে অবদান রাখতে পারত, যদি তারা নিরাপদ পরিবেশ পেত।

ধরা যাক, একটি বাগানে নানা ধরনের ফুল রয়েছে—গোলাপ, বেলি, সূর্যমুখী। যদি বাগানের মালিক শুধু গোলাপকেই ফুল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে কি সেটা প্রকৃত বাগান হয়? হয় না। ঠিক তেমনি, সমাজও যদি শুধু নির্দিষ্ট লিঙ্গ পরিচয়কেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, তাহলে সেটা সুস্থ সমাজ নয়। আমরা সবাই মিলে রঙধনুর মতো—প্রত্যেকে ভিন্ন রঙ, কিন্তু একসঙ্গে অপূর্ব সৌন্দর্য।

কী করা দরকার?

১. শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে—লিঙ্গ পরিচয় ও যৌন বৈচিত্র্য বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

২. আইন ও নীতিমালায় বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে—তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি কাগজে নয়, বাস্তবে দেখতে চাই। চাকরি, শিক্ষা, চিকিৎসায় তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৩. মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে—ঘৃণা বা হাসির বিষয় হিসেবে নয়, হিজড়া ও সমকামী মানুষদের বাস্তব ও সম্মানজনক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।

৪. সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে—যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে। মানবিক আলোচনা, কর্মশালা, এবং জনসচেতনতামূলক প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই মানুষদের প্রতি সহানুভূতির বীজ বপন করতে হবে।

আমরা যদি সমাজে সত্যিকারের সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে আমাদের আগে ঘরের দরজাটাই খুলতে হবে। ভিন্নতা ভয় নয়, সৌন্দর্য। মানুষকে তার যৌনতা বা লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, তার মানবিক গুণাবলির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে।

হোক না কেউ সমকামী, হিজড়া, কিংবা ট্রান্সজেন্ডার—প্রথমেই সে মানুষ। আর সেই মানুষকে সম্মান জানানোই হলো সভ্যতার মূল পরিচয়।

Share: Facebook Twitter Linkedin
May 31, 2020 | admin

বিচিন্তা: যুক্তিভিত্তিক আলোচনার এক সাহসী প্ল্যাটফর্ম

বর্তমান সময়ে যুক্তি, বিজ্ঞান, মানবাধিকার ও সামাজিক সচেতনতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ যতটা বেড়েছে, ঠিক ততটাই বেড়েছে এর বিরোধিতাও। বাংলাদেশে বা উপমহাদেশে এখনো এমন বহু বিষয় রয়েছে যেগুলো নিয়ে কথা বলাকে ট্যাবু বা অপরাধ বলে মনে করা হয়। বিচিন্তা একটি অনলাইন ডিসকাশন ফোরাম, যেখানে সমাজের বিতর্কিত, উপেক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। এন্টি সেমিটিজম, নারী অধিকার, সমকামীতা, লিঙ্গ সমতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ এখানে তোলা হয় যুক্তির আলোকে।

তবে এই ফোরামের কর্মকাণ্ডকে ঘিরে একদল কট্টরপন্থী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ—বিচিন্তা তরুণ প্রজন্মকে ‘বিপথে’ পরিচালিত করছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

এই লেখায় আমরা খতিয়ে দেখব বিচিন্তার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, কেন এটি প্রয়োজনীয় এবং কেন যুক্তিভিত্তিক মুক্তচিন্তা সমাজের অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য।

বিচিন্তা কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

বিচিন্তা কোনো উসকানিমূলক প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এটি একটি মুক্তমঞ্চ যেখানে ভিন্নমত ও প্রশ্ন করার অধিকারকে উৎসাহিত করা হয়। সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিগুলোর পেছনের যুক্তি খোঁজা, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা—এই প্ল্যাটফর্মের মূল ধারা।

এই ধরনের আলোচনার গুরুত্ব বহুস্তরীয়:

  • মানসিক মুক্তি: সমাজের চাপিয়ে দেওয়া চিন্তার বাইরে এসে নিজের মতো করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে।
  • অবদমিত কণ্ঠস্বরের জায়গা: নারীরা, সংখ্যালঘুরা বা এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের মানুষদের মতপ্রকাশের একটি নিরাপদ পরিসর তৈরি হয়।
  • সমাজে যুক্তির চর্চা বাড়ে: অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

কেন কট্টরপন্থীরা এর বিরোধিতা করে

বিচিন্তার আলোচ্য বিষয়গুলো—যেমন ধর্মীয় গোঁড়ামি, নারী স্বাধীনতা, যৌনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা—এই সবই বহু মানুষের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে, বিশেষ করে যারা সামাজিক ক্ষমতার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে ভয় পায়। কট্টরপন্থীরা সাধারণত তিনটি কারণে এর বিরোধিতা করে:

  1. ভয়ের রাজনীতি: তারা মনে করে, প্রশ্ন করার অধিকার সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।
  2. তথ্য-অজ্ঞতা: অনেকেই যে বিষয়ে বিরক্ত হন, তারা সেসব বিষয়ে পড়েন না বা বোঝেন না। ফলে অপপ্রচার সহজ হয়।
  3. ক্ষমতা হারানোর শঙ্কা: যে সমাজে মানুষ নিজের মতো করে ভাবতে শেখে, সেখানে নিয়ন্ত্রণমূলক আদর্শ টিকে থাকতে পারে না।

‘বিপথগামীতা’—আসলে কার সংজ্ঞায়?

কিছু বিরোধীরা দাবি করে যে বিচিন্তা তরুণদের ‘বিপথে’ নিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বিপথগামীতা কার সংজ্ঞা অনুযায়ী? যদি নিজের পরিচয় নিয়ে চিন্তা করা, যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন তোলা, সংখ্যালঘুর অধিকারের পক্ষে কথা বলা ‘বিপথগামীতা’ হয়, তাহলে সেই সমাজব্যবস্থার ভিত্তি কতটা ন্যায্য?

যদি তরুণরা যৌন সম্মতি, নারীর শরীরের অধিকার, ধর্মীয় সহনশীলতা, এবং বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা নিয়ে আলোচনা করে, তবে সেটিকে বিপথ নয় বরং পথের খোঁজ বলা উচিত।

বিচিন্তা-র মতো প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা

সমাজের অগ্রগতির ইতিহাস দেখলে দেখা যায়—প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে বিতর্ক, প্রশ্ন এবং যুক্তিভিত্তিক চিন্তার অবদান রয়েছে। গ্যালিলিও থেকে বেগম রোকেয়া পর্যন্ত—তাঁদের সবাইকেই একসময় “বিপথগামী” বলা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস জানে, তাঁদের চিন্তা সমাজকে আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

আজকের বিচিন্তা সেই ঐতিহ্যের অংশ। এটি কোনো চূড়ান্ত সত্য প্রতিষ্ঠা করে না, বরং সত্য খোঁজার প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেয়।

বিচিন্তা একটি প্রতিবাদ নয়, বরং একটি প্রস্তাব—একটি যুক্তির মাধ্যমে ভাবার প্রস্তাব। সমাজে আলোচনার, মতপার্থক্যের, এবং সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার একটি প্রয়াস। যারা এটি থামিয়ে দিতে চায়, তারা আসলে অন্ধকারেই সমাজকে বেঁধে রাখতে চায়।

এই সময়টা এমন এক সময়, যখন ভয় নয়—যুক্তি দিয়ে পথ খোঁজার দরকার। বিচিন্তার মতো সাহসী প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রয়োজন আরও বেশি, আরও বিস্তৃত পরিসরে।

Share: Facebook Twitter Linkedin
April 17, 2020 | admin

উগ্রতার মুখোমুখি: বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় চরমপন্থা

ধর্মীয় উগ্রবাদ বর্তমান বিশ্বে এক জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটের নাম, যা কেবল একটি রাষ্ট্র বা একটি জাতিগোষ্ঠীর সীমায় আবদ্ধ নয়। এটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেমন ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে, তেমনি বাংলাদেশেও এর উপস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস মূলত মানুষের আত্মিক উন্নয়ন, নৈতিকতা চর্চা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কিন্তু যখন সেই ধর্মবিশ্বাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়, এবং ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন তা হয়ে ওঠে উগ্রবাদ—যা ধর্মের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান একটি জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে কিছু গোষ্ঠী ধর্মের নামে সহিংসতা ও বিভেদ ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। কখনো রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে, কখনো বিদেশি চরমপন্থী আদর্শের প্রভাবে, আবার কখনো সামাজিক অবিচার ও বঞ্চনার সুযোগ নিয়ে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ব্লগার হত্যা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের নামে সহিংস প্রতিক্রিয়া—এসব ঘটনার পেছনে ছিল এক ধরনের সংগঠিত ও চরমপন্থী চিন্তা, যেটি সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে।

বর্হিবিশ্বেও ধর্মীয় উগ্রবাদ এক বৈশ্বিক আতঙ্কের রূপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে ইসলামী উগ্রবাদ যেমন ভয়ংকর রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে, তেমনি ইউরোপ ও আমেরিকায় খ্রিস্টীয় বা বৌদ্ধ ধর্মের চরমপন্থাও রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার কারণ হয়েছে। ‘আল-কায়েদা’, ‘আইএস’, ‘বোকো হারাম’-এর মতো সংগঠনগুলো ধর্মের নামে বিশ্বব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রভাবে মুসলিমরা আজ বিশ্বজুড়ে সন্দেহ ও ঘৃণার মুখোমুখি। অন্যদিকে, ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর হাতে মসজিদে হামলা, মুসলিম বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বা ধর্মীয় পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা, একইভাবে এক ধরণের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং উগ্রতারই বহিঃপ্রকাশ।

উগ্রবাদকে জিইয়ে রাখে অজ্ঞতা, হতাশা, দারিদ্র্য, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক অপব্যবহার। এই সব উপাদান যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চিন্তা ও চেতনায় জায়গা করে নেয়, তখন ধর্মকে ব্যবহার করে তারা হয়ে ওঠে সহিংস, অসহিষ্ণু এবং মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। এটা বোঝা জরুরি যে, উগ্রবাদ কোনো ধর্মেরই প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং এটি কিছু লোকের বিকৃত মানসিকতারই প্রকাশ, যারা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য পূরণে সচেষ্ট।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আশার কথা হলো—ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী মহল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাঝে সচেতনতা বেড়েছে। তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি ও শিক্ষার মাধ্যমে বিকল্প চিন্তা ও সহনশীলতার চর্চা করছে। একইসাথে প্রয়োজন ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাখ্যার আধুনিকায়ন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে—ধর্ম আসলে শান্তির, সহমর্মিতার, এবং মানবিকতার শিক্ষা দেয়। আন্তর্জাতিকভাবে, রাষ্ট্রগুলোর উচিত নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ধর্মীয় সহিংসতা ও উগ্রবাদ দমন করার লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা।

উগ্রতা কখনো কোনো সমস্যার সমাধান নয়; বরং তা নতুন সংকটের জন্ম দেয়। তাই প্রয়োজন সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, এবং বহুত্ববাদী চিন্তাকে উৎসাহিত করা। তাহলেই ধর্মীয় উগ্রবাদের ধ্বংসাত্মক পথ থেকে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব ফিরে আসতে পারবে মানবতার পথে।

Share: Facebook Twitter Linkedin
February 12, 2020 | admin

লিঙ্গ সমতার পথে বাংলাদেশ: অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির নানা সূচকে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে লিঙ্গ সমতার ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং স্বাস্থ্যখাতে প্রবেশ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তবুও, সমাজে বিদ্যমান কিছু কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক বাধা এখনো লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

নারীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অগ্রগতি

বাংলাদেশে নারী শিক্ষায় বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের ভর্তি হারের দিক থেকে এখন ছেলেদের চেয়েও এগিয়ে। UNESCO-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা প্রায় অর্জিত হয়েছে। মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই বিতরণ এবং বিদ্যালয়ে শৌচাগারের ব্যবস্থা এই অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করেছে।

স্বাস্থ্যখাতে, মাতৃমৃত্যু হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০০১ সালে প্রতি লাখে যেখানে ৩২২ জন নারী মাতৃত্বজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করতেন, ২০২০ সালে তা নেমে এসেছে ১৬৩-তে (সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)। পরিবার পরিকল্পনা, প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে।

নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ

নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের হারও ক্রমাগত বাড়ছে। পোশাকশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই খাতে কাজ করেন, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী। এছাড়া, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখছে।

তবে এখানেও সমস্যার জায়গা রয়েছে। নারীদের বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেগুলোতে শ্রমিক অধিকারের নিশ্চয়তা কম। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, মাতৃত্বকালীন সুবিধার অভাব এবং ন্যায্য মজুরি না পাওয়ার অভিযোগ এখনো অনেকাংশে বিদ্যমান।

রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন

সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীরা নিয়মিতভাবে প্রতিনিধিত্ব করছেন। বর্তমানে (২০২4 সালের তথ্যানুযায়ী) সংসদে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা প্রায় ৫০ জনের বেশি। পাশাপাশি, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ বেড়েছে।

তবে এটি এখনো গঠনমূলক অংশগ্রহণ নয় বলে সমালোচনার মুখে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া নারীর নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

সামাজিক বাধা ও বৈষম্য

সমাজে নারীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এখনো লিঙ্গ বৈষম্যের বড় কারণ। বাল্যবিয়ে, গৃহস্থালির অগণ্য দায়িত্ব, দাম্পত্য জীবনে সহিংসতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকীর্ণতা নারীর বিকাশকে ব্যাহত করে। UNICEF-এর তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে এখনও প্রায় ৫১ শতাংশ নারী ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যায়।

তাছাড়া, Decision-making বা সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা এখনও সীমিত। পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজে নারীদের অনেক সিদ্ধান্তই পুরুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

ভবিষ্যতের পথচলা

লিঙ্গ সমতা অর্জনে সরকারি নীতি, আইন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে লিঙ্গ সচেতনতামূলক পাঠক্রম অন্তর্ভুক্তি, গণমাধ্যমে ইতিবাচক নারী চিত্র উপস্থাপন এবং সামাজিক আন্দোলন—সবকিছু মিলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতার সমাজ গঠনে সহায়ক হতে পারে।

নারীর উন্নয়ন মানে শুধু নারী নয়, পুরো জাতির অগ্রগতি। তাই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করে নারীদের পূর্ণ ও সমঅধিকারে সমাজে অন্তর্ভুক্ত করাই হবে টেকসই ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি।

Share: Facebook Twitter Linkedin
January 9, 2020 | admin

নারী স্বাধীনতা ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংঘটন: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে নারী স্বাধীনতার প্রশ্নটি নিছক নারী-পুরুষ সমতার ধারণায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি গভীরভাবে যুক্ত একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে, যেখানে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যায় না। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংঘটনগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশে, বরাবরই নারী স্বাধীনতা প্রশ্নে একটি নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে কথা বলে এসেছে—যা অনেক সময় নারী অধিকারের ধারণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়েছে।

বাংলাদেশের নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু হয় বহু আগেই, বৃটিশ শাসনামলের শেষ দিকে। তখনকার সমাজে নারী শিক্ষা এবং পর্দাপ্রথা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। সেই ধারারই অগ্রগামী ছিলেন বেগম রোকেয়া, যিনি ধর্মের ছাঁদ না ভেঙেই নারী জাগরণকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে এসে আমরা দেখি, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো অনেকাংশে রোকেয়ার বিপরীত সুরে কথা বলে। তারা নারীকে একটি ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চায়, যেখানে স্বাধীন মতপ্রকাশ, পোশাকের স্বাধীনতা কিংবা পেশাগত অংশগ্রহণ প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে নারীর অংশগ্রহণ যুদ্ধকাল থেকেই স্পষ্ট। তারা চিকিৎসা দিয়েছে, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, শরণার্থী শিবিরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু যুদ্ধশেষে নারীদের এই অবদান যেভাবে অবমূল্যায়িত হয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে বলে দেয়—এই রাষ্ট্র তখনো নারীকে পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত ছিল না। যুদ্ধকালীন ধর্ষণের শিকার নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ ঘোষণা করলেও বাস্তবে তারা অনেকেই সামাজিকভাবে বর্জিত, অবহেলিত ও নিঃস্ব ছিলেন।

স্বাধীনতার কিছু বছর পর, যখন বাংলাদেশ সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আবার ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে প্রবেশাধিকার পেতে শুরু করে। ১৯৮৮ সালে যখন ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়, তখন থেকে এক ধরনের মৌলবাদী ভাষ্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে শুরু করে। নারীর পোশাক, কর্মজীবনে উপস্থিতি কিংবা শিক্ষার অধিকার এই ভাষ্যের প্রধান টার্গেট হয়ে ওঠে। হেফাজতে ইসলাম নামক সংগঠনটি ২০১৩ সালে প্রকাশ্যে নারীদের ‘অবাধ চলাফেরা’, ‘অপশালীনতা’ এবং ‘অমুসলিম আদলে’ জীবন যাপনের বিরুদ্ধে ১৩ দফা দাবি তোলে। তারা সরাসরি নারীর ঘরের বাইরে কাজ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেয় এবং নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাবের কথা বলে।

এই ধরনের দাবিগুলোর প্রভাব সরাসরি নারীর প্রতি সামাজিক মনোভাবকে প্রভাবিত করে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নারীর গৃহে অবস্থান করাকে শ্রেষ্ঠত্বের পর্যায়ে তুলে ধরার ফলে অনেক জায়গায় নারীরা শিক্ষা, চিকিৎসা বা কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত হন। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক মাদ্রাসা বা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীর শিক্ষা সীমিত রাখা হয়, যেখানে পবিত্রতা ও পর্দাকে অতিরঞ্জিতভাবে প্রচার করা হয়। অথচ এই দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিমালাই বলে, নারী ও পুরুষ সমানভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে।

অবশ্য, এর বিপরীতে একটি সচেতন, শিক্ষিত ও প্রতিবাদী নারী সমাজও গড়ে উঠেছে, যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদের অধিকার খর্ব করার বিপক্ষে সোচ্চার। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নারীপক্ষ, ব্লাস্টসহ বহু নারী সংগঠন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দাবির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে, বিবৃতি দিয়েছে এবং আইনি লড়াই লড়েছে। তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, ধর্ম কখনো নারীর অধিকার দমন করার অস্ত্র হতে পারে না।

তবে বিষয়টি শুধু দ্বান্দ্বিক নয়। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অনেক নারী এখন এক নতুন ধারার চিন্তায় বিশ্বাসী—যা ধর্ম ও আধুনিকতা, উভয়কে একসাথে ধারণ করতে চায়। এই নারীরা হয়তো বোরকা বা হিজাব পরেন, কিন্তু একই সাথে তাঁরা শিক্ষকতা করেন, ডাক্তার হন, রাজনীতিতে অংশ নেন, এমনকি মাঠ পর্যায়ে কৃষিকাজেও অংশ নিচ্ছেন। এই ধারাটি ধর্মীয় অনুশাসনের ভেতর থেকেও নারী স্বাধীনতার জায়গা খুঁজে নেওয়ার এক প্রয়াস।

বাংলাদেশের সমাজ এখন এক দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে নারী তার যোগ্যতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে—বিমান উড়াচ্ছে, সংসদে আইন প্রণয়ন করছে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় পদক জিতছে। অন্যদিকে এখনো অনেক ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী নারীর স্বাধীনতাকে “নৈতিক বিপর্যয়” বলে আখ্যায়িত করছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।

এই দ্বৈত চিত্রের মধ্যে থেকে উত্তরণের পথ একটাই—সমাজকে বুঝতে হবে, নারী স্বাধীনতা ধর্মের বিপক্ষে নয়, বরং মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন। রাষ্ট্রকেই এই সংকটে নিরপেক্ষ ও ন্যায্য ভূমিকা পালন করতে হবে, যেখানে একজন নারী তার পোশাক, পেশা ও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ধর্ম হোক তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই তার অধিকার ও সম্ভাবনার সীমা না নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের অগ্রগতি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নারীকে শুধু একজন অনুসারী নয়, বরং সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

Share: Facebook Twitter Linkedin
October 12, 2019 | admin

নারী অধিকার বনাম পুরুষতন্ত্র: এক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি বাংলাদেশ

বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে একদিকে নারী অগ্রগতির নানা উদাহরণ তুলে ধরে, অন্যদিকে সমাজ কাঠামোতে এমন এক পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা প্রোথিত রয়েছে যা নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই দ্বিচারিতার একটি উদাহরণ হতে পারে একই সংসদে নারী প্রধানমন্ত্রী ও নারী শ্রমিকের নির্যাতনের সহবাস। এ যেন একদিকে পদ্মা সেতুতে নারীর নেতৃত্ব, অন্যদিকে রিকশার পেছনে “বউ পেটানো আমাদের সংস্কৃতি” লেখা বাস্তবতা।

নারীর অধিকার ও সম্মান নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা উচ্চারণ থাকলেও বাস্তবতা বহুক্ষেত্রেই তা থেকে বিচ্ছিন্ন। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ৩৭.৭% (ILO)। যদিও এটি আগের দশকের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি, তবে এখনও পুরুষদের তুলনায় তা অনেক কম। অথচ UNDP-এর এক জরিপে দেখা গেছে, কর্মজীবী নারীরা পুরুষদের চেয়ে গড়ে ৬৪% বেশি ঘরের কাজ করে থাকেন, যেটি অর্থনৈতিকভাবে অদৃশ্য থাকলেও তাদের ক্লান্তি, সময় ও সৃজনশীলতা নষ্ট করে দেয়।

আইন ও নীতিমালার দিক থেকে বাংলাদেশে নারীদের জন্য অসংখ্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০), পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন (২০১০), এবং স্থানীয় সরকারে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা। তবে Amnesty International-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই আইনগুলোর কার্যকর প্রয়োগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে বিচারপ্রাপ্তির হার মাত্র ৩%–৫% এর মধ্যে। ২০২৩ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ১৩৫০টির মতো (Odhikar রিপোর্ট), কিন্তু মামলা দায়ের হয়েছে এর অর্ধেকেরও কম, আর দণ্ডিত হয়েছে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। আইন আছে, কিন্তু কার্যকারিতা নেই—এটাই আমাদের নারী নিরাপত্তার বাস্তবচিত্র।

শুধু আইন নয়, সামাজিক মনস্তত্ত্বেও নারীর অবস্থান বৈষম্যমূলক। ছোটবেলা থেকে মেয়েরা শিখে বড় হয় “তুই মেয়ে মানুষ, তোর কাজ রান্না শেখা”, আর ছেলেরা শোনে “তুই তো ছেলে, কাঁদিস কেন?” এই ধরণের সাংস্কৃতিক শর্তায়ন পুরুষকে কর্তৃত্বপ্রিয় করে তোলে এবং নারীকে আত্মপরাজিত। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৭২% নারী মনে করেন স্বামী যদি স্ত্রীকে মারে, তবে কোনো না কোনোভাবে স্ত্রীই দায়ী (UNICEF, 2022)। এটি কেবল নির্যাতনের বৈধতা নয়, বরং নিজেদের অধিকারবোধ হারিয়ে ফেলার এক ভয়ঙ্কর সামাজিক চিত্র।

ধর্ম ও সংস্কৃতির অপব্যাখ্যাও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা। ইসলাম নারীকে শিক্ষা ও সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে ওয়ারিশি সম্পত্তিতে মেয়েরা প্রায়শই বঞ্চিত হন। নারীর সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, আর ভাইয়েরা বলে—”বোন তো নিজের সংসার পেয়ে গেছে, এখন আর সম্পত্তির দরকার কী?” এ যেন নারীর সত্তা কেবল সংসারেই সীমাবদ্ধ রাখার এক মোক্ষম কৌশল।

নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল শারীরিক বা অর্থনৈতিক নয়—এর গভীরে রয়েছে এক মনস্তাত্ত্বিক দমননীতি। নারীদের পোশাক, চলাফেরা, এমনকি হাসির ধরণ নিয়েও মন্তব্য করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীদের প্রতি ট্রল, বিকৃত ছবি শেয়ার, এবং কণ্ঠরোধ করার চর্চা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এসব যেন পুরুষতন্ত্রের ডিজিটাল রূপ। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রায় ৮৩% ছিলেন নারী (Bangladesh Cyber Crime Awareness Foundation)।

তবে আশার কথাও আছে। নারীরা লড়ছেন—প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে। রোকেয়া থেকে শুরু করে আজকের দিনেও যে নারীরা ক্ষুদ্র ব্যবসা করছেন, সাংবাদিকতা করছেন, কোর্টে লড়ছেন কিংবা গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হচ্ছেন—তাঁরা প্রত্যেকেই একেকজন সামাজিক প্রতিবিপ্লবী। তবু প্রশ্ন থাকে, তাঁদের এই লড়াই কেন এখনো কেবল “ব্যতিক্রম” হিসেবে দেখা হয়? কেন এটি এখনো স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেনি?

নারীর ক্ষমতায়ন মানে কেবল তাঁর হাতে কিছু অর্থ তুলে দেওয়া নয়। এটি একটি মানসিক বিপ্লব—যেখানে পুরুষ নারীর সমানাধিকারকে নিজের মর্যাদার হুমকি মনে করবে না। সমাজ তখনই বদলাবে, যখন বাবা তার ছেলেকে বলবে, “তুই রান্না শেখ, তোর বোনও তো শিখছে”, কিংবা একজন স্বামী যখন স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষা নয়, গর্ব অনুভব করবে।

বাংলাদেশের সমাজের গভীরে গাঁথা এই পুরুষতন্ত্রকে ভাঙতে হলে কেবল আইন নয়, প্রয়োজন সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন। এবং এই পরিবর্তন শুরু করতে হবে পরিবার থেকে, পাঠ্যপুস্তক থেকে, নাটক-সিনেমা থেকে, এমনকি ধর্মীয় আলোচনার টেবিল থেকেও।

কারণ, নারী অধিকার কোনো বিশেষ সুযোগ নয়, এটি একটি জন্মগত মানবিক অধিকার। আর এই অধিকার নিশ্চিত করা কেবল নারীর জন্য নয়, বরং এক মানবিক রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।

Share: Facebook Twitter Linkedin