২০২৪ সালে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে পরিচিত বক্তা ও ইসলাম বিষয়ক আলোচক আসিফ মাহতাব সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত শরীফ নামের এক শিশুর শরীফা হিসেবে লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশের গল্পকে কেন্দ্র করে একাধিক অবমাননাকর ও বৈষম্যমূলক মন্তব্য করেন। তিনি জনসমক্ষে বইটির পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেন এবং বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের প্রতি বিদ্বেষ ও সামাজিক ঘৃণা উসকে দিতে পারে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার হলেও, কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবমাননা, ঘৃণা বা বৈষম্য ছড়ানো একটি ভিন্ন বিষয়। জনপরিসরে এমন বক্তব্য সমাজে বিদ্যমান পূর্বধারণাকে আরও শক্তিশালী করে এবং ইতোমধ্যেই প্রান্তিক অবস্থায় থাকা মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
ট্রান্সজেন্ডার (Transgender) ব্যক্তি হলেন এমন মানুষ, যাদের লিঙ্গ পরিচয় জন্মের সময় নির্ধারিত লিঙ্গের সঙ্গে মিল নাও থাকতে পারে। এটি কোনো সাময়িক প্রবণতা বা সামাজিক “ফ্যাশন” নয়; বরং মানুষের পরিচয়ের একটি স্বীকৃত বৈচিত্র্য। এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা ও মনোবিজ্ঞানী মহলে দীর্ঘদিনের গবেষণার ভিত্তিতে একটি সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক অবস্থান রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০১৯ সালে তাদের ICD-11 শ্রেণিবিন্যাসে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়কে আর মানসিক রোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রাখেনি; বরং এটিকে লিঙ্গ পরিচয়ের একটি স্বাভাবিক বৈচিত্র্য হিসেবে বিবেচনা করেছে। একইভাবে American Psychological Association (APA) স্পষ্টভাবে বলেছে, “Being transgender is not a mental disorder. It is a natural variation of human experience.”
আসিফ মাহতাবের মতো জনপরিচিত ব্যক্তিদের বক্তব্যের প্রভাব সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। যখন একজন জনপ্রিয় বক্তা কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ব্যঙ্গ, অবমাননা বা ঘৃণার ভাষায় উপস্থাপন করেন, তখন তা কেবল একটি মতামত হয়ে থাকে না; বরং তা সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য ও সহিংসতার পরিবেশকে আরও উসকে দিতে পারে। Human Rights Watch-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা নিয়মিতভাবে পারিবারিক বর্জন, কর্মসংস্থানে বৈষম্য, শারীরিক সহিংসতা এবং সামাজিক নিপীড়নের শিকার হন। তাই জনপরিসরে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য তাদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
অনেকে এই ধরনের বিদ্বেষকে ধর্মীয় অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইসলাম মানুষের মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। পবিত্র কোরআনের সূরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক নারী ও পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো।” এই আয়াত মানুষের বৈচিত্র্যকে অস্বীকার নয়, বরং পারস্পরিক পরিচয় ও মর্যাদার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে। এছাড়া মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়া বিভাগের বিভিন্ন মতামতে চিকিৎসাগতভাবে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের প্রতি ঘৃণা ও অবমাননাকর আচরণকে ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকতে পারে, তবে কোনো মানুষের প্রতি ঘৃণা বা সহিংসতা উসকে দেওয়া ইসলামের মৌলিক নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রও লিঙ্গ বৈচিত্র্যের বাস্তবতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। ২০১৩ সালে সরকার হিজড়া জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে “তৃতীয় লিঙ্গ” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীতে UNDP Bangladesh-এর ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে আনুমানিক ১০ হাজারেরও বেশি ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি বসবাস করেন, যাদের বড় একটি অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানে নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবিক আচরণ কেবল নৈতিক দায়িত্বই নয়, উন্নয়নেরও একটি অপরিহার্য শর্ত।
আমাদের সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা কখনোই এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয়, যেখানে একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে অপমান, অবমাননা বা ঘৃণার লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। মানবাধিকারের মৌলিক নীতি হলো—প্রত্যেক মানুষ মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সমান সম্মানের অধিকারী। তাই ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার পরিবর্তে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা।
গবেষণায়ও দেখা যায়, মানুষ যখন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানার সুযোগ পায় এবং তাদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অবগত হয়, তখন নেতিবাচক মনোভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। শিক্ষা, সংলাপ এবং সহমর্মিতা—এই তিনটিই ঘৃণার সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি আমাদের সমাজের চরিত্র নিয়ে। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়তে চাই, যেখানে একজন মানুষ কেবল তার পরিচয়ের কারণে ঘৃণিত হবে? নাকি আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকলেও প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান বজায় থাকবে?
বিচিন্তা বিশ্বাস করে, কোনো মানুষই তার পরিচয়ের কারণে ঘৃণার শিকার হওয়া উচিত নয়। একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে বিদ্বেষ নয়, সহমর্মিতা; অপমান নয়, যুক্তি; এবং বিভাজন নয়, মানবিক মর্যাদার পক্ষে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে।
—– AMER SULTAN, DHAKA-BANGLADESH
